সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল | Victoria Memorial Hall

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল 

ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সাবেক রাজধানী কলকাতার কেন্দস্থলে তথাকথিত White Town-এ ময়দানে ৬৪ একর এলাকা জুড়ে অবস্থিত ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল ও উদ্যান ভারতে স্থাপিত ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। পৃথিবীর ইতিহাসে এর থেকে বড় কোনো সৌধ কোনো শাসকের উদ্দ্যেশ্যে নির্মিত হয়নি। এই স্থাপত্য ইন্দো-সারাসেনিক রীতির অনন্য নিদর্শন এবং পরবর্তীকালে অন্যান্য স্থাপত্য নির্মাণের (যেমন যোধপুরের উমাইদ ভবন) অনুপ্রেরনা। কলকাতা ভ্রমনের সূচীতে সব্রাগ্রে স্থান করে নেয় এই ভিক্টরিয়া মেমোরিয়াল হল। স্থানীয় অর্থাৎ কলকাতা ও তার সন্নিহিত এলাকার লোকজনের বৈকাল ভ্রমনের জন্য প্রথম পছন্দ হল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, অন্যান্য রাজ্য থেকে এবং বিদেশ থেকে, বিশেষ করে পশ্চিমের পর্যটকগন এখানে আসতে এবং ঔপনিবেশিক শাসনের ঐতিহ্যকে পরখ করতে পছন্দ করে। 

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল বড়লাট লর্ড কার্জনের মস্তিস্কপ্রসূত। ১৮৫৮-এর ভারত শাসন আইন অনুযায়ী ইংল্যান্ডের রানী ভিক্টোরিয়া (১৮৭৬-১৯০১ খ্রিঃ) ভারতের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যেরও সম্রাজ্ঞী। ১৯০১ সালে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্মরনে একটি সৌধ নির্মাণের প্রস্তাব রাখেন লর্ড কার্জন। প্রথমে তিনি ভারত সচিব জর্জ হ্যামিলটনকে চিঠি লিখে জানান (জানুয়ারি, ১৯০১) এবং এর এক মাস পর এশিয়াটিক সোসাইটির ফেলোদের কাছে প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই সৌধ নির্মাণের উদ্দেশ্য হবে কলকাতায় আগত প্রত্যেক ভারতীয় কিংবা ইউরোপীয় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল ভ্রমন করে যেন এই মহিয়সী শাসকের উদার, মানবতাবাদী এবং সমদৃষ্টিসম্পন্ন শাসনকে উপলব্ধি করতে পারে এবং  অনুপ্রানিত হতে পারে।  এই প্রস্তাব রাজকর্মচারী, পণ্ডিত, রাজনীতবিদ এবং ভারতীয়দের কাছে সমাদৃত হয়। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল নির্মাণের উদ্দ্যেশ্যে ১ কোটি ৫ লক্ষ টাকা অনুদান সংগৃহীত হয় এবং ১৯০৬ সালে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। এর মুল স্থপতি হলেন উইলিয়াম এমারসন এবং Martin & Co. এর নির্মাণকার্জ সম্পাদন করে। ১৯২১-এ নির্মাণকার্জ সমাপ্ত হয় এবং জনসাধারনের জন্য উন্মুক্ত হয়। 

ব্রিটিশ ও মুঘল স্থাপত্যের সাথে ইতালীয়, মিশরীয় এবং দাক্ষিণাত্য স্থাপত্যরীতির সমন্বয়ে সাদা মাকরানা মার্বেল দিয়ে নির্মিত হয়েছে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল। ভবনটির উচ্চতা ১৮৪ ফুট, দৈর্ঘ্য ৩৩৮ ফুট ও প্রস্থ ২২৮ ফুট। এর কেন্দ্রীয় কক্ষের ব্যাস ৬৪ ফুট, যা তাজমহলের কেন্দ্রীয় কক্ষের তুলনায় সামান্য বেশি। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল যে কাঠামোগতভাবে তাজমহলের দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রানিত তা দেখেই বোঝা যায়। এর কেন্দ্রীয় গম্বুজ, চারটি অনুষঙ্গী গম্বুজ, অষ্টকোনবিশিষ্ট গম্বুজসহ ছত্রী, উচ্চ প্রবেশপথ, প্রশস্ত ছাদ, এবং কোণার গম্বুজযুক্ত মিনারগুলি তাজমলের কথা মনে করিয়ে দেয়। এর অভ্যন্তরে বৃত্তাকার কক্ষের দেওয়াল জুড়ে রয়েছে Frank Owen Salisbury চিত্রিত ১২টি বৃহৎ ক্যানভাস চিত্র (lunettes)।  ভিক্টোরিয়ার জীবনের বিভিন্ন ঘটনা এখানে চিত্রিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় গম্বুজের শীর্ষে রয়েছে Esch নির্মিত ১৬ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট Angel of Victory। গম্বুজটির চারপাশে শিল্প, স্থাপত্য, ন্যায়বিচার ও দানশীলতা-র মতো বিভিন্ন রূপকধর্মী ভাস্কর্য রয়েছে। উত্তর বারান্দার উপরে রয়েছে মাতৃত্ব, বিচক্ষণতা এবং শিক্ষা-র প্রতীকী ভাস্কর্য। ১৮৯৭ সালে রানি ভিক্টোরিয়ার হীরকজয়ন্তী উপলক্ষে কলকাতায় স্থাপনের জন্য জর্জ ফ্র্যাম্পটনকে একটি মূর্তি নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ব্রোঞ্জে নির্মিত এই মূর্তিতে বৃদ্ধা রানি ভিক্টোরিয়াকে সিংহাসনে উপবিষ্ট অবস্থায় দেখানো হয়েছে। তিনি Order of the Star of India-র রাজকীয় পোশাক পরিহিত এবং হাতে রাজদণ্ড ও রাজগোলক ধারণ করে আছেন। এই মূর্তিটি হলের বাইরে উত্তর গেটের সামনে বসানো আছে। আরেকটি মূর্তি আছে সেন্ট্রাল হলে। এটি লর্ড কার্জনের নির্দেশে টমাস ব্রুক নির্মিত রানি ভিক্টোরিয়ার রাজ্যাভিষেকের পোশাক পরিহিত সাদা মার্বেল পাথরের মূর্তি। 

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল একটি মিউজিয়ামও। এই মিউজিয়ামে মোট ২৫টি কক্ষ আছে। Central Hall ছাড়াও এখানে রয়েছে Royal Gallery, National Leader's Gallery, Portrait Gallery, Sculpture Gallery, Arms and Armory Gallery এবং নবীনতম Kolkata Gallery. এর মধ্যে কলকাতা গ্যালারি বড়ই চিত্তাকর্ষক। ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হওয়ার আগে পর্যন্ত কলকাতা নগরীর বিকাশের ইতিহাস visual display এর মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৮৬ সালে সৈয়দ নুরুল হাসান পশ্চিম বঙ্গের রাজ্যপাল হন এবং তাঁরই উৎসাহে এই গ্যালারির নির্মাণ হয়েছিল। সাম্প্রতিক কালে এখানে 3D Projection Mapping Technology -এর মাধ্যমে ভবনের সাদা মার্বেল পাথরের দেওয়ালে লাইট এন্ড সাউন্ড শো-র আয়োজন শুরু হয়েছে। প্রতি মঙ্গলবার থেকে রবিবার পর্যন্ত সপ্তাহে ৬ দিন আয়োজন হয়, যেখানে কলকাতার ইতিহাস দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যমে দেখানো হয়। 

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল ভারতের অন্যতম সর্বাধিক পর্যটন করা সংগ্রহশালা এবং পর্যটন কেন্দ্র।ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল কর্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য এবং বিভিন্ন সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর এখানে গড়ে ৩৫ লক্ষ থেকে ৫০ লক্ষ পর্যটক আসেন। শুধুমাত্র ২০২৩-২৪ অর্থবছরই এই সংখ্যা ৩৬ লক্ষ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এর মধ্যে গড়ে ১ লক্ষ থেকে ২ লক্ষ বিদেশী পর্যটক আসেন। মূলত যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ বিশেষ করে কমনওয়েলথভুক্ত রাষ্ট্রগুলো থেকে প্রচুর পর্যটক এখানে আসেন। এ ছাড়া প্রতিবেশী বাংলাদেশ এবং সার্ক (SAARC) ভুক্ত দেশগুলো থেকেও বহু পর্যটক নিয়মিত ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল পরিদর্শনে আসেন। ভারতের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ বিদেশী পর্যটক আগমনে যে প্রথম তিনের মধ্যে থাকে তার প্রধান আকর্ষণ এই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আরবদের সিন্ধু অভিযানঃ প্রত্যক্ষ কারণ ও তাৎপর্য | Arab Conquest of Sindh: Immediate Causes and Significance

আরবদের সিন্ধু অভিযানঃ প্রত্যক্ষ কারণ ও তাৎপর্য সপ্তম শতকের প্রথমার্ধে আরবদেশে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। ইসলাম আরবদের নতুন করে জীবনীশক্তির সঞ্চার করে । ইসলাম ক্রমশ: একটি ধর্ম থেকে রাজনৈতিক শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় তারা আরবীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ভারতবর্ষের সঙ্গে আরবদের যোগাযোগ দীর্ঘদিনের। বাণিজ্যিক সূত্রে তারা নিয়মিত ভারতের উপকূল গুলিতে, বিশেষ করে মালাবার উপকূলে আসত। ভারতীয় ও চীনা পণ্য 'ধাও' নামক বিশেষ জাহাজে করে নিয়ে তারা ইউরোপের বাজারে বিক্রি করত। 712 খ্রিস্টাব্দে ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এর সেনাপতি ও জামাতা মোহাম্মদ বিন কাসেম সিন্ধু দেশে একটি সফল অভিযান করেন এবং সিন্ধুদেশ আরবীয় মুসলমানদের অধীনে চলে যায়। অভিযানের(প্রত্যক্ষ) কারণ ভারতবর্ষের প্রতি আরবদের দীর্ঘদিনের নজর ছিল। এর আগেও বহুবার ভারতের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পাঠানো হয়েছিল। তবে এই(712 খৃ:) অভিযানের একটি প্রত্যক্ষ কারণ ছিল। জানা যায় যে সিংহলের রাজা ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কে কয়েকটি জাহাজে করে উপঢৌকন পাঠাচ্ছিলেন কিন্তু পথে সিন্ধু দেশের জলদস্যুরা দেবল বন্দরে এ...

মহাফেজখানার শ্রেণীবিভাগ | Category of Archives

মহাফেজখানার শ্রেণীবিভাগ মহাফেজখানা বা লেখ্যাগারগুলি সাধারণ জনতার জন্য নয় মূলত গবেষক, ঐতিহাসিক, আইনবিদ, চিত্র পরিচালক প্রভৃতি পেশার লোকজন তাদের গবেষণার কাজে লেখ্যাগারে নথি পত্র দেখতে পারেন।  লেখ্যাগার পরিচালনা ও সংরক্ষিত নথির ভিত্তিতে লেখ্যাগগুলিকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়েছে।   1. সরকারি লেখ্যাগার:- কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার বা স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে যে লেখ্যাগারগুলি গড়ে ওঠে। সেগুলিকে সরকারি লেখ্যাগার বলা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এরকম সরকার পরিচালিত এক বা একাধিক লেখ্যাগার থাকে। যেমন, আমেরিকার Natonal Archive And records Administration (NARA)। ভারতবর্ষে র কেন্দ্রীয় লেখ্যাগার National Archive of India নামে পরিচিত। বিভিন্ন ঐতিহাসিক, প্রশাসনিক ও আইনগত নথি, মানচিত্র, নক্সা,  পাণ্ডুলিপি প্রভৃতি সংরক্ষিত থাকে। 2. বানিজ্যিক লেখ্যাগার:-  এটি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানের লেখ্যাগার বিভিন্ন বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান   মূলত তাদের সংস্থার ঐতিহাসিক এবং বানিজ্যিক নথি সংরক্ষিত রাখে। যেমন, ভারতের প্রথম বানিজ্যিক লেখ্যাগার হলো পুনার Tata Centrel Archive। 3. অলাভজনক লেখ্যাগ...

ষোড়শ শতকীয় ইউরোপে মূল্যবিপ্লব | Price Revolution

 ষোড়শ শতকের ইউরোপে মূল্য বিপ্লব   16 শতাব্দীতে ইউরোপীয় অর্থনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো মূল্য বিপ্লব। নিত্যব্যবহার্য পণ্যের মূল্য প্রায় 150 বছর সুস্থির থাকার পর ঊর্ধ্বমুখী হতে আরম্ভ করে, এবং 16 শতাব্দীর শেষে খাদ্যপণ্যের মূল্যের প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। পশ্চিম ইউরোপের অর্থনীতিতে এমন অভাবনীয় এবং সুদুরপ্রসারী ফলাফলসম্পন্ন ঘটনা মূল্য বিপ্লব নামে পরিচিত। মূল্য বিপ্লবের কতগুলি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যথা--    (১) কৃষিজ পণ্যের তুলনায় শিল্পজাত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি ছিল কম, এবং খাদ্যশস্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। (২) ভূমি রাজস্ব সহ ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক, তোলা ইত্যাদির হার বৃদ্ধি এবং ফটকাবাজির আবির্ভাব। (৩) মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় মজুরির হার খুবই কম ছিল বলে প্রকৃত আয় হ্রাস পেয়েছিল। (৪) ভূমি বিক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত হওয়া। (৫) গ্রামীণ বুর্জোয়াজি শ্রেণীর আবির্ভাব। ষোড়শ শতকের আগেও প্রাকৃতিক কারণে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল, তবে তা ছিল 2, 3 শতাংশের মতো, যা অস্বাভাবিক মনে হতো না। কিন্তু ষোল শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে যে নিরবিচ্ছিন্ন মূল্যবৃদ্ধি হ...