সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

উনিশ শতকে নারী শিক্ষা

 উনিশ শতকে নারী শিক্ষার বিস্তার সম্পর্কে আলোচনা কর। 


লিঙ্গ বা সৌন্দর্য যার উপর আমাদের কোন হাত নেই, সে নিয়ে মানুষের ভেদাভেদ চিরকালের। মূলত প্রথম থেকেই নারীদের প্রতি সমাজের একটি ক্ষীণ দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যায় আর এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী নারীকে একেবারে সমাজের নিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়। প্রাচীন যুগে নারীদের শিক্ষার কিছু সুযোগ থাকলেও মধ্যযুগের শেষভাগ এবং বিশেষত উপনিবেশিক পূর্ববর্তী সময়ে সেই সুযোগ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ, সাহিত্য, ধর্মীয় গ্রন্থ আলোচনা করলে দেখা যায় উপনিবেশিক শাসনের সূচনাকালে অধিকাংশ ভারতীয় নারী প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা, ধর্মীয় কুসংস্কার, বাল্যবিবাহ, অন্দরমহল কেন্দ্রিক জীবন যাপন এবং লিঙ্গভিত্তিক শ্রম বিভাজন নারীদের শিক্ষা প্রদানে অন্তরায় ছিল। বিশেষত হিন্দু সমাজে এই বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে মেয়েরা বেশি পড়াশোনা করলে স্বামীর অকাল মৃত্যু ঘটতে পারে বা সংসারের অমঙ্গল হতে পারে। এই ধরনের কুসংস্কারকে কেন্দ্র করে কন্যাশিক্ষাকে নিরুৎসাহিত করা হতো।

ব্রিটিশরা ভারত শাসন প্রতিষ্ঠা করার পর ভারতীয়দের সমাজের রীতিনীতি, আচার-আচরণ, বিশেষ করে মহিলাদের ঘরে আবদ্ধ করে রাখা এইসব নীতি নিয়ে তারা ভারতীয় সমাজকে তীব্রভাবে নিন্দা করেছিল। এ বিষয়ে জেমস মিলের history of British India এর কথা বলতে পারি। অপরদিকে বৃটিশদের হেয় এর দরুন ও ১৯ শতকের সংস্কারকরা ভারতীয় নারীদের শিক্ষিত করার ব্যাপারে ভূমিকা নিয়েছিল। 

 তারা উপলব্ধি করেছিল শিক্ষার মাধ্যমে এমন এক নারী জাতি গড়ে তুলতে যারা আধুনিক পুরুষদের সঙ্গে সঠিকভাবে মানিয়ে নিতে পারবে। এছাড়াও মনে করা হয়েছিল নারী যদি শিক্ষিত হয়ে ওঠে তবে সে একজন আদর্শ মা তে পরিণত হবে যে মা একজন আদর্শ সন্তানকে জন্ম দেবে। যে সন্তান হবে কুসংস্কার মুক্ত ও নৈতিক জ্ঞান সম্পন্ন। এমনকি সমাচার দর্পণে ১৮৩৮ এ চিঠি বেরোয় যে একজন আধুনিক পুরুষ সারাদিনের ক্লান্তির পর একজন অশিক্ষিত স্ত্রীর কাছ থেকে কি পর্যাপ্ত সুখ পেতে পারে। মূলত এইসব সমস্ত তাগিদ থেকেই উনিশ শতকের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীদের শিক্ষার ক্ষেত্রে এগিয়ে আসে। 


বলা হয় যে যেদিন থেকে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় সেই দিন থেকেই অনিবার্য হয়ে ওঠে নারী শিক্ষা। ওই কলেজ যে অভিনব পুরুষ তৈরি করতে থাকে এর জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়ে  অভিনব নারী অর্থাৎ নারী শিক্ষা নারীর জন্য হয়নি, হয়েছিল পুরুষের জন্য। নারী শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল নারী শিক্ষিত হবে কিন্তু তার ফল ভোগ করবে পুরুষ। ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দ এবং ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দ বৃটিশদের উদ্যোগে কয়েকটি মেয়েদের বিদ্যালয় গড়ে উঠলেও সেগুলি সফল হয়নি। ১৮৩০ এর দশক এ এর পরিবর্তন ঘটতে থাকে। লেখাপড়া জানা পুরুষদের প্রয়োজন হয়ে ওঠে শিক্ষিত নারী। শুরু হয় নারীদের শিক্ষিত করার প্রয়াস। দেখা যায় শিক্ষিত স্বামীরা তাদের অশিক্ষিত স্ত্রীদের ঘরের মধ্যেই শিক্ষা দিতে শুরু করে। এই সমস্ত স্বামীরা নিজের হাতেই তৈরি করে তাদের শিক্ষিত স্ত্রীদের। আবার একই সাথে চালু করা হয় জেনানা শিক্ষা ব্যবস্থা। যার দ্বারা একজন ইউরোপীয় শিক্ষিত মহিলা শিক্ষক অন্দরমহলে গিয়ে নারীদের শিক্ষাদান করত। উপরিক্ত দুটো উপায়ে যে সমস্ত নারীরা শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কৈলাস বাসিনী দেবী থেকে শুরু করে কুমুদিনী দেবী, জ্ঞান দানেন্দিনী দেবী, বামা সুন্দরী প্রমুখ। 


এছাড়াও নারীদের জন্য গড়ে উঠতে‌ থাকে একাধিক বিদ্যালয়। 1849 সালে বেথুন কলকাতায় স্থাপন করেন ভিক্টোরিয়া গার্লস স্কুল যার পরে নাম হয় বেথুন বালিকা বিদ্যালয়। এ বিদ্যালয় থেকেই শুরু হয় বাঙালি নারীদের ধারাবাহিক প্রতিষ্ঠানক শিক্ষা। ইংরেজদের উদ্যোগে ও বিদ্যাসাগরের মতো দেশী উৎসাহীদের সহযোগিতায় বিদ্যাসাগর 1857-58 সাল নাগাদ নদীয়া, বর্ধমান, হুগলি জেলায় নিজো খরচে ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় গড়ে তোলেন যেখানে প্রায় 1300 ছাত্রী পড়াশোনা করতো। বাংলার নারী শিক্ষার বিস্তারে স্কুল বুক অফ সোসাইটি ও ব্রহ্মসমাজের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। তবে মেয়েদের পাঠক্রম কি হবে তা নিয়ে ব্রাহ্মসমাজের অভ্যন্তরে চরম বিতর্ক তৈরি হয় কেশবচন্দ্র সেন এর মত ব্রহ্ম নেতারা মনে করতেন মেয়েদের বিজ্ঞান, গণিত, ইতিহাস, দর্শন ইত্যাদি পড়ার দরকার নেই। কিছুটা সাহিত্য, ধর্মগ্রন্থ, সেলাই, গৃহ বিজ্ঞান এইসব করলেই হবে। কিন্তু দুর্গা মোহনদাস প্রমুখ ব্রহ্ম নেতারা কেশবচন্দ্র সেনের নারী শিক্ষার দিকগুলির বিরোধিতা করে বলেছিলেন নারী শিখবে সবকিছুই। কিন্তু তা সত্বেও নারীদের যে ধরনের শিক্ষা দেওয়া হোক না কেন নারী শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল আকর্ষণীয় সহচরী, সুগৃহিনী, সুমাতা উৎপাদন করা। 


যেহেতু বিয়েই নারী শিক্ষার উদ্দেশ্য গুলির মধ্যে অন্যতম ছিল এবং যে সমস্ত নারীরা শিক্ষাকে নিয়েছিল বিয়ের সিঁড়ি রূপে তারা তেমন ভবে এগোতে পারিনি। কিন্তু যারা শিক্ষাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল তারা অনেকেই বিয়ে করেননি বা করেছেন বেশ দেরিতে এবং কেউ কেউ বিয়ে করে নষ্ট করেছেন জীবন। উদাহরণস্বরূপ প্রথম MA চন্দ্রমুখী বসুর কথা বলতে পারি, যিনি বিয়ে করেছিলেন ৪১ বছর বয়সে। এমনকি তার বোন বিধুমুখী অবিবাহিত  থাকে আজীবন। এছাড়াও কামিনী রায় বিয়ে করে ৩০ বছর বয়সে।


তবে উনিশ শতকে নারীরা শিক্ষিত হয়ে উঠলেও বা ভদ্রমহিলা রূপে পরিচিত পেলেও পেশাগ্রহণের অধিকার তাদের ছিল না। সমাজ শুধু শিক্ষকতা ও চিকিৎসা বা ধাত্রীবিদ্যা পেশা হিসেবে নারীর জন্য রেখেছিল। আসলে উপরিক্ত এই বিষয়গুলি প্রমাণ করে যে নারী শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল আকর্শনীয় সহচরী, ও শয্যাসঙ্গিনী উৎপাদন। নারীর সর্বাঙ্গীণ বিকাশ কিংবা অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এই নারী শিক্ষার লক্ষ্য ছিল না।











মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আরবদের সিন্ধু অভিযানঃ প্রত্যক্ষ কারণ ও তাৎপর্য | Arab Conquest of Sindh: Immediate Causes and Significance

আরবদের সিন্ধু অভিযানঃ প্রত্যক্ষ কারণ ও তাৎপর্য সপ্তম শতকের প্রথমার্ধে আরবদেশে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। ইসলাম আরবদের নতুন করে জীবনীশক্তির সঞ্চার করে । ইসলাম ক্রমশ: একটি ধর্ম থেকে রাজনৈতিক শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় তারা আরবীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ভারতবর্ষের সঙ্গে আরবদের যোগাযোগ দীর্ঘদিনের। বাণিজ্যিক সূত্রে তারা নিয়মিত ভারতের উপকূল গুলিতে, বিশেষ করে মালাবার উপকূলে আসত। ভারতীয় ও চীনা পণ্য 'ধাও' নামক বিশেষ জাহাজে করে নিয়ে তারা ইউরোপের বাজারে বিক্রি করত। 712 খ্রিস্টাব্দে ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এর সেনাপতি ও জামাতা মোহাম্মদ বিন কাসেম সিন্ধু দেশে একটি সফল অভিযান করেন এবং সিন্ধুদেশ আরবীয় মুসলমানদের অধীনে চলে যায়। অভিযানের(প্রত্যক্ষ) কারণ ভারতবর্ষের প্রতি আরবদের দীর্ঘদিনের নজর ছিল। এর আগেও বহুবার ভারতের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পাঠানো হয়েছিল। তবে এই(712 খৃ:) অভিযানের একটি প্রত্যক্ষ কারণ ছিল। জানা যায় যে সিংহলের রাজা ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কে কয়েকটি জাহাজে করে উপঢৌকন পাঠাচ্ছিলেন কিন্তু পথে সিন্ধু দেশের জলদস্যুরা দেবল বন্দরে এ...

মহাফেজখানার শ্রেণীবিভাগ | Category of Archives

মহাফেজখানার শ্রেণীবিভাগ মহাফেজখানা বা লেখ্যাগারগুলি সাধারণ জনতার জন্য নয় মূলত গবেষক, ঐতিহাসিক, আইনবিদ, চিত্র পরিচালক প্রভৃতি পেশার লোকজন তাদের গবেষণার কাজে লেখ্যাগারে নথি পত্র দেখতে পারেন।  লেখ্যাগার পরিচালনা ও সংরক্ষিত নথির ভিত্তিতে লেখ্যাগগুলিকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়েছে।   1. সরকারি লেখ্যাগার:- কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার বা স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে যে লেখ্যাগারগুলি গড়ে ওঠে। সেগুলিকে সরকারি লেখ্যাগার বলা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এরকম সরকার পরিচালিত এক বা একাধিক লেখ্যাগার থাকে। যেমন, আমেরিকার Natonal Archive And records Administration (NARA)। ভারতবর্ষে র কেন্দ্রীয় লেখ্যাগার National Archive of India নামে পরিচিত। বিভিন্ন ঐতিহাসিক, প্রশাসনিক ও আইনগত নথি, মানচিত্র, নক্সা,  পাণ্ডুলিপি প্রভৃতি সংরক্ষিত থাকে। 2. বানিজ্যিক লেখ্যাগার:-  এটি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানের লেখ্যাগার বিভিন্ন বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান   মূলত তাদের সংস্থার ঐতিহাসিক এবং বানিজ্যিক নথি সংরক্ষিত রাখে। যেমন, ভারতের প্রথম বানিজ্যিক লেখ্যাগার হলো পুনার Tata Centrel Archive। 3. অলাভজনক লেখ্যাগ...

ষোড়শ শতকীয় ইউরোপে মূল্যবিপ্লব | Price Revolution

 ষোড়শ শতকের ইউরোপে মূল্য বিপ্লব   16 শতাব্দীতে ইউরোপীয় অর্থনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো মূল্য বিপ্লব। নিত্যব্যবহার্য পণ্যের মূল্য প্রায় 150 বছর সুস্থির থাকার পর ঊর্ধ্বমুখী হতে আরম্ভ করে, এবং 16 শতাব্দীর শেষে খাদ্যপণ্যের মূল্যের প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। পশ্চিম ইউরোপের অর্থনীতিতে এমন অভাবনীয় এবং সুদুরপ্রসারী ফলাফলসম্পন্ন ঘটনা মূল্য বিপ্লব নামে পরিচিত। মূল্য বিপ্লবের কতগুলি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যথা--    (১) কৃষিজ পণ্যের তুলনায় শিল্পজাত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি ছিল কম, এবং খাদ্যশস্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। (২) ভূমি রাজস্ব সহ ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক, তোলা ইত্যাদির হার বৃদ্ধি এবং ফটকাবাজির আবির্ভাব। (৩) মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় মজুরির হার খুবই কম ছিল বলে প্রকৃত আয় হ্রাস পেয়েছিল। (৪) ভূমি বিক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত হওয়া। (৫) গ্রামীণ বুর্জোয়াজি শ্রেণীর আবির্ভাব। ষোড়শ শতকের আগেও প্রাকৃতিক কারণে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল, তবে তা ছিল 2, 3 শতাংশের মতো, যা অস্বাভাবিক মনে হতো না। কিন্তু ষোল শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে যে নিরবিচ্ছিন্ন মূল্যবৃদ্ধি হ...