সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

গান্ধীবাদী জাতীয় আন্দোলনে নারী

 গান্ধীবাদী জাতীয় আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা আলোচনা কর। 

ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ বলেছেন যে রাজনীতি ও সামাজিক আন্দোলনের ময়দানে নারীদের নিয়ে আসা ছিল গান্ধীজীর নারী জাগরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অবদান। ইংরেজদের বেড়ি ছিঁড়ে বের হতে তিনি পুরুষদের পাশাপাশি চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ নারীদের ও মুক্ত আকাশের নিচে রাজপথে নামিয়ে এনেছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর সমাজ সংস্কার আন্দোলন এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে স্বদেশী আন্দোলনের মাধ্যমে নারীদের জন পরিসরে প্রবেশের যে ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল, তা 1920 এর দশকে গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ, আইন অমান্য ও ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সর্বভারতীয় রূপ লাভ করেছিল। 

দক্ষিণ আফ্রিকায় সত্যাগ্রহ পরিচালনার সময় গান্ধীজী নারীদের আত্মত্যাগ, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং নৈতিক মুক্তির গুরুত্ব উপলব্ধি করেন এবং এই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি ভারতের নারীদের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে যুক্ত করার পরিকল্পনা করেন। তার মতে অহিংসা সংগ্রামের জন্য ধৈর্য, সহানুভূতি, আত্মত্যাগ, আত্ম সংযম এর মত গুণাবলী গুলি বিশেষভাবে প্রয়োজন আর ভারতীয় নারীরা ঐতিহাসিকভাবে এই গুণাবলীর অধিকারী। এর পাশাপাশি গান্ধীজী বাল্যবিবাহ রোধ, অস্পৃশ্যতা, মদ্যপান ও নারী নির্যাতন রোধ করা ইত্যাদি গঠনমূলক কর্মসূচি নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের জন্য একটি নিরাপদ ও নৈতিক ক্ষেত্র সৃষ্টি করে। 

আদর্শ ভারতীয় নারীত্বের ধারণায় গান্ধী নারী যৌনতা কে নাকচ করে মাতৃত্বের অপেক্ষা ভাগ্নির ভূমিকার উপর দৃষ্টিপাত করেন। তিনি দ্রৌপদী, সীতা, দয়মন্তী, সাবিত্রী প্রমুখ পৌরাণিক চরিত্রকে ভারতীয় নারীদের জন্য আদর্শ হিসেবে বেছেছেন। কারণ এরা কখনোই তাদের স্বামীর দাস ছিল না বরং এরা ছিল অত্যন্ত নীতি-নিষ্ঠা এবং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের মঙ্গলার্থে চূড়ান্ত স্বার্থত্যাগের বা প্রতিক। গান্ধী এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দিয়েছিলেন সীতাকে, কারণ ব্রিটিশ রাজ কে সহজেই রাবণের সাথে তুলনা করা যায়। তবে মুসলমান সম্মোধন করার সময় তিনি সাধারণভাবে রামায়ণ-মহাভারতের এই উপমা গুলিকে এড়িয়ে গিয়ে মুসলমান মহিলাদের দেশ ও ইসলামের জন্য আত্মত্যাগ করতে বলেছিলেন। 

নারীদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার প্রশ্নেও গান্ধীজী বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি নারীদের তাদের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মধ্যে থেকেই চরকায় সুতো কেটে, বিদেশী কাপড় ও মদের দোকানে পিকেটিং এর মাধ্যমে জাতীয় সেবার জন্য আহ্বান জানান। বাংলার নারীরা গান্ধীর এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে অসহযোগ আন্দোলনে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করেন। তারা বিদেশি বস্ত্র, মদের দোকানের সামনে পিকেটিং ও খাদির প্রচার, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অর্থ সংগ্রহ, সভা মিছিল এবং কংগ্রেসের গঠনমূলক কর্মসূচিতে তারা সক্রিয়ভাবে ভূমিকা পালন করেন। কলকাতা কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নারী কর্মমন্দির, মহিলা কর্মসমাজ প্রভূতি সংগঠন অসহযোগ আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণের প্রধান ভিত্তি হয়। বাসন্তী দেবী, উর্মিলা দেবী, সুনিতা দেবী নারী কর্মমন্দিরের অন্যতম সংগঠনিক ছিলেন। কংগ্রেসের স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী নিষিদ্ধ করা কে কেন্দ্র করে তারা প্রতিবাদ করে এবং 1921 সালে গ্রেফতার হন। এরপর ১৯২১ সালে ২৪শে ডিসেম্বর প্রিন্স অফ ওয়েলসের কলকাতা আগমনের দিন বাসন্তী দেবী ও উর্মিলা দেবীর উদ্যোগে সর্বত্রব্যাপি ধর্মঘট পালিত হয়। অসহযোগ আন্দোলনের ওপর উল্লেখযোগ্য নেত্রী ছিলেন হেমপ্রভা দেবী। 1921 সালে চাঁদপুর ও গোয়ালন্দে স্টিমার ধর্মঘট এর সময় তিনিও তার স্বামী বসন্ত মজুমদার ও অন্য বিদ্রোহীদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন।

অসহযোগ আন্দোলন বাংলার বিভিন্ন জেলায় দ্রুত বিস্তার লাভ করে। এই সময় বাংলার বিভিন্ন জেলায় সরলা দেবী (সিলেট), প্রভা চট্টোপাধ্যায় (বালুঘাট) ইন্দুমতী গুহ ঠাকুর (বেড়িয়াল) সুনীল মিত্র প্রমুখ নারী অসহযোগ আন্দোলন শক্তিশালী করে তোলে। 


গান্ধীজীর আবেদন শুধুমাত্র সমাজের শিক্ষানীয় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি তা প্রান্তিক মহিলাদের কাছেও পৌঁছেছিল। যেমন যৌনকর্মী ও দেবদাসীর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল। তাই ১৯৩০ সালে গান্ধীর ডান্ডি অভিযান  এবং লবণ আইন ভঙ্গের মধ্য দিয়ে আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা হলে, বাংলার নারীরা সক্রিয়ভাবে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। সুমিত সরকার লিখেছেন আইন অমান্য আন্দোলন, বিশেষত মেদিনীপুর, কলকাতা, পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে অসাধারণ জনসমর্থন অর্জন করেছিল। এখানে লবণ আইন ভঙ্গের পাশাপাশি বিদেশী বস্ত্র বর্জন, মদের দোকানে পিকেটিং, জাতীয় পতাকা উত্তোলন, ব্রিটিশ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন এবং গ্রেপ্তার হওয়া সম্মেলিয়ে আন্দোলন ব্যাপক গতিবিধি লাভ করে।


আইন অমান্য আন্দোলনের সময় নারীদের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে একাধিক মহিলা সংগঠন গড়ে ওঠে। ১৯৩০ সালে উর্মিলা দেবীর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত নারী সত্যাগ্রহ সমিতি কলকাতায় নারীদের সংঘটিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। 


১৯৪২ সালে ৪ই আগস্ট বোম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় কংগ্রেসের কমিটির অধিবেশনে ভারত ছাড়ো প্রস্তাব গৃহীত হলে গান্ধীজীর সামনে Do or Die এর উচ্চারণ করেন। এবং অহিংসা সত্যাগ্রহের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের ডাক দিলে নারীরা তাতে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করে এবং গান্ধী, নেহেরু প্যাটেল প্রমুখ কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতাদের গ্রেপ্তার হওয়ার পর নারী-পুরুষ সর্ব নির্বিশেষে আন্দোলন অব্যাহত রাখে। ১৯৪২ এর আন্দোলনে নারীরা আরোও সংগঠিত, আত্মবিশ্বাসী এবং নেতৃত্ব দানের ক্ষেত্রে অতি সক্রিয় হয়ে ওঠে। সভা, মিছিল বা প্রচার কার্যের পাশাপাশি তারা স্বামীর নেতৃত্ব গ্রহণ, বার্তাবাহক হিসেবেও কাজ করা, স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন পরিচালনা করা, গোপন যোগাযোগ রক্ষা করা এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে গণপতিরোধ সংগ্রহীত করার ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন নারীরা।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আরবদের সিন্ধু অভিযানঃ প্রত্যক্ষ কারণ ও তাৎপর্য | Arab Conquest of Sindh: Immediate Causes and Significance

আরবদের সিন্ধু অভিযানঃ প্রত্যক্ষ কারণ ও তাৎপর্য সপ্তম শতকের প্রথমার্ধে আরবদেশে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। ইসলাম আরবদের নতুন করে জীবনীশক্তির সঞ্চার করে । ইসলাম ক্রমশ: একটি ধর্ম থেকে রাজনৈতিক শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় তারা আরবীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ভারতবর্ষের সঙ্গে আরবদের যোগাযোগ দীর্ঘদিনের। বাণিজ্যিক সূত্রে তারা নিয়মিত ভারতের উপকূল গুলিতে, বিশেষ করে মালাবার উপকূলে আসত। ভারতীয় ও চীনা পণ্য 'ধাও' নামক বিশেষ জাহাজে করে নিয়ে তারা ইউরোপের বাজারে বিক্রি করত। 712 খ্রিস্টাব্দে ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এর সেনাপতি ও জামাতা মোহাম্মদ বিন কাসেম সিন্ধু দেশে একটি সফল অভিযান করেন এবং সিন্ধুদেশ আরবীয় মুসলমানদের অধীনে চলে যায়। অভিযানের(প্রত্যক্ষ) কারণ ভারতবর্ষের প্রতি আরবদের দীর্ঘদিনের নজর ছিল। এর আগেও বহুবার ভারতের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পাঠানো হয়েছিল। তবে এই(712 খৃ:) অভিযানের একটি প্রত্যক্ষ কারণ ছিল। জানা যায় যে সিংহলের রাজা ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কে কয়েকটি জাহাজে করে উপঢৌকন পাঠাচ্ছিলেন কিন্তু পথে সিন্ধু দেশের জলদস্যুরা দেবল বন্দরে এ...

মহাফেজখানার শ্রেণীবিভাগ | Category of Archives

মহাফেজখানার শ্রেণীবিভাগ মহাফেজখানা বা লেখ্যাগারগুলি সাধারণ জনতার জন্য নয় মূলত গবেষক, ঐতিহাসিক, আইনবিদ, চিত্র পরিচালক প্রভৃতি পেশার লোকজন তাদের গবেষণার কাজে লেখ্যাগারে নথি পত্র দেখতে পারেন।  লেখ্যাগার পরিচালনা ও সংরক্ষিত নথির ভিত্তিতে লেখ্যাগগুলিকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়েছে।   1. সরকারি লেখ্যাগার:- কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার বা স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে যে লেখ্যাগারগুলি গড়ে ওঠে। সেগুলিকে সরকারি লেখ্যাগার বলা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এরকম সরকার পরিচালিত এক বা একাধিক লেখ্যাগার থাকে। যেমন, আমেরিকার Natonal Archive And records Administration (NARA)। ভারতবর্ষে র কেন্দ্রীয় লেখ্যাগার National Archive of India নামে পরিচিত। বিভিন্ন ঐতিহাসিক, প্রশাসনিক ও আইনগত নথি, মানচিত্র, নক্সা,  পাণ্ডুলিপি প্রভৃতি সংরক্ষিত থাকে। 2. বানিজ্যিক লেখ্যাগার:-  এটি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানের লেখ্যাগার বিভিন্ন বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান   মূলত তাদের সংস্থার ঐতিহাসিক এবং বানিজ্যিক নথি সংরক্ষিত রাখে। যেমন, ভারতের প্রথম বানিজ্যিক লেখ্যাগার হলো পুনার Tata Centrel Archive। 3. অলাভজনক লেখ্যাগ...

ষোড়শ শতকীয় ইউরোপে মূল্যবিপ্লব | Price Revolution

 ষোড়শ শতকের ইউরোপে মূল্য বিপ্লব   16 শতাব্দীতে ইউরোপীয় অর্থনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো মূল্য বিপ্লব। নিত্যব্যবহার্য পণ্যের মূল্য প্রায় 150 বছর সুস্থির থাকার পর ঊর্ধ্বমুখী হতে আরম্ভ করে, এবং 16 শতাব্দীর শেষে খাদ্যপণ্যের মূল্যের প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। পশ্চিম ইউরোপের অর্থনীতিতে এমন অভাবনীয় এবং সুদুরপ্রসারী ফলাফলসম্পন্ন ঘটনা মূল্য বিপ্লব নামে পরিচিত। মূল্য বিপ্লবের কতগুলি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যথা--    (১) কৃষিজ পণ্যের তুলনায় শিল্পজাত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি ছিল কম, এবং খাদ্যশস্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। (২) ভূমি রাজস্ব সহ ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক, তোলা ইত্যাদির হার বৃদ্ধি এবং ফটকাবাজির আবির্ভাব। (৩) মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় মজুরির হার খুবই কম ছিল বলে প্রকৃত আয় হ্রাস পেয়েছিল। (৪) ভূমি বিক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত হওয়া। (৫) গ্রামীণ বুর্জোয়াজি শ্রেণীর আবির্ভাব। ষোড়শ শতকের আগেও প্রাকৃতিক কারণে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল, তবে তা ছিল 2, 3 শতাংশের মতো, যা অস্বাভাবিক মনে হতো না। কিন্তু ষোল শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে যে নিরবিচ্ছিন্ন মূল্যবৃদ্ধি হ...