সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে সমাজে নারীর অবস্থান সম্পর্কে আলোচনা কর।

 ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে সমাজে নারীর অবস্থান সম্পর্কে আলোচনা কর।

ঊনবিংশ শতকের ভারতীয় সমাজে নারীর অবস্থান ছিল গভীর বৈষম্য, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবর্তনশীলতার এক জটিল সমন্বয়। এই যুগের নারীজীবনকে কেবল সতীদাহ, বাল্যবিবাহ বা বিধবাজীবনের মতো কয়েকটি সামাজিক কুপ্রথার আলোচনায় সীমাবদ্ধ করলে প্রকৃত ঐতিহাসিক চিত্রটি সম্পূর্ণ বোঝা যায় না। নারীর অবস্থান নির্ধারিত হতো পিতৃতান্ত্রিক পরিবার, ধর্মীয় বিধিনিষেধ, জাতিভেদ, শ্রেণিগত অবস্থান, সম্পত্তির অধিকার, শ্রমের প্রকৃতি এবং আঞ্চলিক সামাজিক কাঠামোর দ্বারা। ফলে ঊনবিংশ শতকের ভারতীয় নারী বলতে কোনো একক ও অভিন্ন অভিজ্ঞতাকে বোঝায় না। উচ্চবর্ণের শিক্ষিত বা অভিজাত হিন্দু নারীর জীবন, কৃষক ও শ্রমজীবী নারীর জীবন, মুসলিম নারীর অভিজ্ঞতা, দলিত নারীর অবস্থান কিংবা কেরল ও উত্তর-পূর্ব ভারতের কিছু মাতৃতান্ত্রিক সমাজের নারীর জীবন একই ধরনের ছিল না। আধুনিক নারী-ইতিহাসচর্চা তাই ভারতীয় নারীকে একটি একক প্রতীক হিসেবে নয়, বহুবিধ সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে অবস্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠীর নারী হিসেবে বিশ্লেষণ করার উপর গুরুত্ব দেয়।নারীকে প্রধানত কন্যা, স্ত্রী এবং মাতা হিসেবে মূল্যায়ন করা হতো। তাঁর ব্যক্তিসত্তা বা স্বাধীন ইচ্ছার চেয়ে পারিবারিক কর্তব্যকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হতো।
ঊনবিংশ শতকে বিশেষত উচ্চবর্ণ ও উচ্চবিত্ত ভারতীয় সমাজে নারীজীবনের প্রধান পরিসর ছিল গৃহের অভ্যন্তর। বাংলায় 'অন্দরমহল', উত্তর ভারতে 'জেনানা' বা অন্যান্য অঞ্চলে অনুরূপ গৃহভিত্তিক নারীপরিসর-এসবের মাধ্যমে নারী ও পুরুষের সামাজিক জগৎকে পৃথক করে দেখা হতো। বহির্জগৎ ছিল প্রধানত পুরুষের কর্মক্ষেত্র। শিক্ষা, প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, আইন-আদালত এবং জনজীবনের সঙ্গে পুরুষের সম্পর্ক ছিল প্রত্যক্ষ্য। 
উনিশ ও বিশ শতকের প্রথমভাগে অধিকাংশ ভারতীয় নারীর জীবন মূলত অন্দরমহল-কেন্দ্রিক ছিল। তাঁদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের পরিসর ছিল অত্যন্ত সীমিত। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যাওয়ার সুযোগ তাঁরা খুব কমই পেতেন। বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁদের ঘোমটা, শাড়ির আঁচল কিংবা বোরখার আড়ালে থাকতে হতো। একা বাইরে যাওয়া প্রায় অকল্পনীয় ছিল; কয়েকজন মহিলা একসঙ্গে বেরোলেও তাঁদের সঙ্গে সাধারণত কোনো পুরুষ আত্মীয় বা অভিভাবক থাকতেন। রক্ষণশীল হিন্দু পরিবারগুলিতে নারীদের চলাফেরার ওপর নানা ধরনের সামাজিক বিধিনিষেধ আরোপিত ছিল। এমনকি বিশ শতকের গোড়াতেও কিছু পরিবারে মহিলাদের জুতো পরা অনুচিত বলে মনে করা হতো
পর্দাপ্রথার কঠোরতা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত ছিল। মূলত পর্দা শুধু নারীর চলাফেরা নিয়ন্ত্রণের একটি ব্যবস্থা ছিল না; এটি অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সামাজিক মর্যাদা, সম্মান ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হতো। বিশেষত উচ্চবিত্ত ও রক্ষণশীল পরিবারে নারীর প্রকাশ্য উপস্থিতি যত কম, পরিবারের সামাজিক মর্যাদা তত বেশি-এমন একটি ধারণা প্রচলিত ছিল।
অন্দরমহলে আবদ্ধ জীবনযাপন করলেও নারীদের দৈনন্দিন জীবন একেবারে নিষ্ক্রিয় ছিল না।বিশেষত কাঁথা সেলাই, আলপনা গয়নাবড়ি, ঘর সাজানোর সামগ্রী এবং বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্পে তাঁদের শিল্পবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। কাঁথার নকশায় তাঁরা অনেক সময় নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা, পারিবারিক ঘটনা, আনন্দ-বেদনা ও মনের নানা অনুভূতি ফুটিয়ে তুলতেন।
নারীদের মৌখিক সংস্কৃতিও ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। শিক্ষা ও লেখাপড়ার সুযোগ সীমিত হওয়ায় তাঁদের অনেক অভিজ্ঞতা লিখিত সাহিত্যে স্থান পেত না; বরং প্রবাদ, ছড়া, পাঁচালি, লোককথা ও নানা ধরনের মুখে-মুখে প্রচলিত বচনের মাধ্যমে তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ত। এই মৌখিক ঐতিহ্যের মধ্যেও নারীদের, জীবনবোধ, অভিজ্ঞতা, সামাজিক পর্যবেক্ষণ এবং আনন্দ-বেদনার প্রতিফলন দেখা যায়। 
এছাড়াও শিশুপালন ছিল নারীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক দায়িত্ব। বিশেষত অভিজাত ও সচ্ছল পরিবারগুলিতে শিশুদের দেখাশোনার জন্য বিভিন্ন ধরনের সহায়িকা নিযুক্ত থাকতেন। তাঁদের মধ্যে উপযুক্ত কেউ কেউ শিশুকে স্তন্যপানও করাতেন। একান্নবর্তী পরিবারে শিশুপালনের দায়িত্ব শুধু জন্মদাত্রী মায়ের ওপর সীমাবদ্ধ থাকত না। পরিবারের বয়স্কা মহিলারা, অন্যান্য আত্মীয়া এবং সহায়িকাদের সহযোগিতায় শিশুর যত্ন ও লালন-পালনের কাজ সম্পন্ন করতেন। ফলে একটি শিশুর বেড়ে ওঠা ছিল মূলত সমগ্র পরিবারের সম্মিলিত দায়িত্ব।
তৎকালীন ভারতীয় সমাজে দাম্পত্য জীবনও নানা সামাজিক বিধিনিষেধ ও প্রচলিত রীতিনীতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। বিশেষত রক্ষণশীল হিন্দু পরিবারে স্বামীকে স্ত্রীর 'দেবতা' হিসেবে বিবেচনা করা হতো। স্বামীর ব্যক্তিগত দোষ-ত্রুটি, দুর্বলতা কিংবা চারিত্রিক সমস্যা থাকলেও স্ত্রীর কাছ থেকে তাঁর প্রতি আনুগত্য ও কর্তব্যপরায়ণতা প্রত্যাশিত ছিল। স্ত্রীর নিজস্ব মতামত বা ব্যক্তিগত ইচ্ছার তুলনায় স্বামীর প্রতি কর্তব্যকেই অধিক গুরুত্ব দেওয়া হতো? ফলে দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে নারীর অবস্থান ছিল মূলত অধীনস্থের। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক মেলামেশার ক্ষেত্রেও নানা সামাজিক বিধিনিষেধ কার্যকর ছিল। অনেক রক্ষণশীল পরিবারে দিনের বেলায় স্বামী-স্ত্রীর প্রকাশ্য সাক্ষাৎ বা ঘনিষ্ঠতাকে অশোভন বলে মনে করা হতো।স্বামী যদি কর্মসূত্রে বা অন্য কোনও কারণে দূরে অবস্থান করতেন এবং স্ত্রীকে চিঠি লিখতেন, তবে নিরক্ষর স্ত্রীকে সেই চিঠি পড়ার জন্য কোনো পুরুষ আত্মীয়ের সাহায্য নিতে হতো। একইভাবে নিজের বক্তব্য জানিয়ে উত্তর পাঠানোর ক্ষেত্রেও তাঁকে অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হতো।
কন্যাসন্তান সম্পর্কে তৎকালীন সমাজে প্রচলিত মনোভাবও ছিল অত্যন্ত জটিল ও বৈষম্যমূলক। বহু রক্ষণশীল পরিবারে কন্যার জন্মকে আনন্দের পরিবর্তে বোঝা হিসেবে দেখা হতো। এর অন্যতম কারণ ছিল কন্যার বিবাহের সঙ্গে যুক্ত আর্থিক দায়। বিশেষত বাল্যবিবাহের প্রচলন এবং পণ বা যৌতুকের সামাজিক চাপের ফলে কন্যাসন্তানকে পরিবারের ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক বোঝা হিসেবে বিবেচেনা করা হতো।ফলে অনেক পরিবারে পুত্রসন্তানের আকাঙ্ক্ষা প্রবল ছিল। অন্যদিকে পুত্রসন্তানকে পরিবারের বংশধারা ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষার প্রধান উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
প্রচলিত হিন্দু সামাজিক ও ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী পুত্রই পিতা-মাতার বার্ধক্যে তাঁদের ভরণপোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করবে এবং মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদানের মতো ধর্মীয় কর্তব্য সম্পন্ন করবে। বিশ্বাস করা হতো যে পুত্রের ধর্মীয় কর্তব্য পালনের মাধ্যমে মৃত পিতা-মাতা স্বর্গ লাভ করবেন। এই ধর্মীয় ও সামাজিক ধারণাগুলি পুত্রসন্তানের প্রতি পরিবারের আকাঙ্ক্ষাকে আরও শক্তিশালী করেছিল এবং কন্যাসন্তানের প্রতি বৈষম্যমূলক মনোভাবকে দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিল

বাল্যবিবাহ প্রচলিত থাকার ফলে বহু কন্যাশিশুর শৈশব ও কৈশোর পিতৃগৃহে নয়, শ্বশুরবাড়িতেই অতিবাহিত হতো। পিতৃগৃহে থাকাকালীন প্রায় পাঁচ বছর বয়স থেকেই মেয়েদের বিভিন্ন ব্রত ও ধর্মীয় আচার পালন শেখানো হতোঅর্থাৎ ব্রত ও আচার পালনের মধ্য দিয়েই তাঁদের 'নারী' হিসেবে সামাজিকীকরণের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়ে যেত।

অন্দরমহলের দৈনন্দিন জীবনেও নারী-পুরুষের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন ছিল। পরিবারের পুরুষ সদস্যদের খাওয়া শেষ হওয়ার পরেই সাধারণত মহিলারা আহার করতেন। এর ফলে তাঁদের সামাজিক অবস্থানের দিকটা স্পষ্ট হয়ে উঠত।

বিধবা নারীদের সামাজিক অবস্থান ছিল আরও করুণ। কুমারী ও সধবা নারীদের বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিধবাদের উপস্থিতি অনেকক্ষেত্রে অশুভ বলে বিবেচিত হতো। হিন্দু সমাজে সতীপ্রথার প্রচলনের ফলে স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর কাছে সহমরণকে একসময় আদর্শ ও সামাজিক মর্যাদার বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হতো।
বিধবাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। বহু ক্ষেত্রে তাঁদের স্বাধীন সম্পত্তির‌ অধিকার সীমিত ছিল এবং স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়েও নানা সামাজিক ও আইনগত বিধিনিষেধ কার্যকর ছিল।ফলে বিধবারা প্রায়শই আর্থিকভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তেন।

বাল্যবিবাহ ও কুলীন প্রথার ফলে বাল্যবিধবার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য ছিল। বিশেষ করে কুলীন ব্রাহ্মণ সমাজে এমন বহু কিশোরী ছিল, যাদের অল্প বয়সে বয়স্ক কুলীন পুরুষের সঙ্গে বিবাহ দেওয়া হলেও স্বামীর সঙ্গে বাস্তবে তাঁদের দাম্পত্য জীবন গড়ে ওঠেনি। কখনও কখনও স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যুসংবাদ এসে পৌঁছত এবং অল্পবয়সি মেয়েটিকে বৈধব্যের কঠোর নিয়ম মেনে চলতে হতো। বিধবাদের চুল কেটে দেওয়া, অলংকার ও সাজসজ্জা নিষিদ্ধ করা এবং সাদা পোশাক পরতে বাধ্য করার মতো প্রথা তাঁদের ব্যক্তিসত্তা ও সৌন্দর্যবোধকে দমন করত। তাঁদের জীবন থেকে আনন্দ, উৎসব ও সামাজিক অংশগ্রহণ প্রায় সম্পূর্ণভাবে বাদ পড়ে যেত।
ঊনবিংশ শতকের প্রথমভাগে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে অধিকাংশ ভারতীয় নারী বঞ্চিত ছিলেন। রক্ষণশীল সমাজে নারীশিক্ষা নিয়ে সন্দেহ ছিল। শিক্ষিত নারী সংসারের প্রচলিত নিয়ম মানবেন না-এমন আশঙ্কা প্রকাশ করা হতো। এমনকি মেয়েদের পড়াশোনার সঙ্গে বৈধব্যের মতো অযৌক্তিক কুসংস্কারকেও যুক্ত করা হয়েছিল।

পরিশেষে বলা যায় ভারতের সর্বত্র বিধবার অবস্থান একরকম ছিল না। উত্তর ভারতের কিছু মহিল অঞ্চলে বিধবার পুনর্বিবাহের একটি বিশেষ রীতি প্রচলিত ছিল, যার মাধ্যমে বিধবা নারী দেবরকে বিবাহ করতে পারতেন। এই ধরনের প্রথা বিধবার সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি উপায় হিসেবে কাজ করত। আবার কিছু অঞ্চলে বিবাহিত গার্হত নারীর পারিবারিক অবস্থানও ছিল জটিল; স্বামীর পাশাপাশি তাঁকে দেবর ও ভাসুরদের সঙ্গে একই বৃহৎ পারিবারিক পরিসরে বসবাস করতে হতো। ফলে নারীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ক্ষেত্র অত্যন্ত সীমিত ছিল। উত্তর-পশ্চিম ভারতের রাজস্থান, হরিয়ানা প্রভৃতি অঞ্চলের কিছু সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্য আরও কঠোর রূপ ধারণ করেছিল। কন্যাশিশু হত্যা, বাল্যবিবাহ, কন্যাবিক্রয় এবং সতীপ্রথার মতো নানা অমানবিক প্রথা সেখানে বিভিন্ন সময়ে প্রচলিত ছিল। এর পেছনে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ, বংশরক্ষার ধারণা; পণ বা বিবাহজনিত অর্থনৈতিক চাপ এবং নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আরবদের সিন্ধু অভিযানঃ প্রত্যক্ষ কারণ ও তাৎপর্য | Arab Conquest of Sindh: Immediate Causes and Significance

আরবদের সিন্ধু অভিযানঃ প্রত্যক্ষ কারণ ও তাৎপর্য সপ্তম শতকের প্রথমার্ধে আরবদেশে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। ইসলাম আরবদের নতুন করে জীবনীশক্তির সঞ্চার করে । ইসলাম ক্রমশ: একটি ধর্ম থেকে রাজনৈতিক শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় তারা আরবীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ভারতবর্ষের সঙ্গে আরবদের যোগাযোগ দীর্ঘদিনের। বাণিজ্যিক সূত্রে তারা নিয়মিত ভারতের উপকূল গুলিতে, বিশেষ করে মালাবার উপকূলে আসত। ভারতীয় ও চীনা পণ্য 'ধাও' নামক বিশেষ জাহাজে করে নিয়ে তারা ইউরোপের বাজারে বিক্রি করত। 712 খ্রিস্টাব্দে ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এর সেনাপতি ও জামাতা মোহাম্মদ বিন কাসেম সিন্ধু দেশে একটি সফল অভিযান করেন এবং সিন্ধুদেশ আরবীয় মুসলমানদের অধীনে চলে যায়। অভিযানের(প্রত্যক্ষ) কারণ ভারতবর্ষের প্রতি আরবদের দীর্ঘদিনের নজর ছিল। এর আগেও বহুবার ভারতের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পাঠানো হয়েছিল। তবে এই(712 খৃ:) অভিযানের একটি প্রত্যক্ষ কারণ ছিল। জানা যায় যে সিংহলের রাজা ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কে কয়েকটি জাহাজে করে উপঢৌকন পাঠাচ্ছিলেন কিন্তু পথে সিন্ধু দেশের জলদস্যুরা দেবল বন্দরে এ...

মহাফেজখানার শ্রেণীবিভাগ | Category of Archives

মহাফেজখানার শ্রেণীবিভাগ মহাফেজখানা বা লেখ্যাগারগুলি সাধারণ জনতার জন্য নয় মূলত গবেষক, ঐতিহাসিক, আইনবিদ, চিত্র পরিচালক প্রভৃতি পেশার লোকজন তাদের গবেষণার কাজে লেখ্যাগারে নথি পত্র দেখতে পারেন।  লেখ্যাগার পরিচালনা ও সংরক্ষিত নথির ভিত্তিতে লেখ্যাগগুলিকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়েছে।   1. সরকারি লেখ্যাগার:- কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার বা স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে যে লেখ্যাগারগুলি গড়ে ওঠে। সেগুলিকে সরকারি লেখ্যাগার বলা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এরকম সরকার পরিচালিত এক বা একাধিক লেখ্যাগার থাকে। যেমন, আমেরিকার Natonal Archive And records Administration (NARA)। ভারতবর্ষে র কেন্দ্রীয় লেখ্যাগার National Archive of India নামে পরিচিত। বিভিন্ন ঐতিহাসিক, প্রশাসনিক ও আইনগত নথি, মানচিত্র, নক্সা,  পাণ্ডুলিপি প্রভৃতি সংরক্ষিত থাকে। 2. বানিজ্যিক লেখ্যাগার:-  এটি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানের লেখ্যাগার বিভিন্ন বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান   মূলত তাদের সংস্থার ঐতিহাসিক এবং বানিজ্যিক নথি সংরক্ষিত রাখে। যেমন, ভারতের প্রথম বানিজ্যিক লেখ্যাগার হলো পুনার Tata Centrel Archive। 3. অলাভজনক লেখ্যাগ...

ষোড়শ শতকীয় ইউরোপে মূল্যবিপ্লব | Price Revolution

 ষোড়শ শতকের ইউরোপে মূল্য বিপ্লব   16 শতাব্দীতে ইউরোপীয় অর্থনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো মূল্য বিপ্লব। নিত্যব্যবহার্য পণ্যের মূল্য প্রায় 150 বছর সুস্থির থাকার পর ঊর্ধ্বমুখী হতে আরম্ভ করে, এবং 16 শতাব্দীর শেষে খাদ্যপণ্যের মূল্যের প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। পশ্চিম ইউরোপের অর্থনীতিতে এমন অভাবনীয় এবং সুদুরপ্রসারী ফলাফলসম্পন্ন ঘটনা মূল্য বিপ্লব নামে পরিচিত। মূল্য বিপ্লবের কতগুলি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যথা--    (১) কৃষিজ পণ্যের তুলনায় শিল্পজাত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি ছিল কম, এবং খাদ্যশস্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। (২) ভূমি রাজস্ব সহ ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক, তোলা ইত্যাদির হার বৃদ্ধি এবং ফটকাবাজির আবির্ভাব। (৩) মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় মজুরির হার খুবই কম ছিল বলে প্রকৃত আয় হ্রাস পেয়েছিল। (৪) ভূমি বিক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত হওয়া। (৫) গ্রামীণ বুর্জোয়াজি শ্রেণীর আবির্ভাব। ষোড়শ শতকের আগেও প্রাকৃতিক কারণে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল, তবে তা ছিল 2, 3 শতাংশের মতো, যা অস্বাভাবিক মনে হতো না। কিন্তু ষোল শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে যে নিরবিচ্ছিন্ন মূল্যবৃদ্ধি হ...