একটি ঐতিহাসিক স্থল হিসাবে হাম্পির পর্যটন গুরুত্ব
কর্ণাটকের বেল্লারি জেলায় তুঙ্গভদ্রা নদীর তীরে অবস্থিত হাম্পি দক্ষিণ ভারতীয় (দ্রাবিড়) স্থাপত্য কীর্তির এক অনবদ্য নিদর্শন। এখনো পর্যন্ত প্রত্নতাত্বিক নিদর্শনের যতটা টিকে (১৬০০-র-ও বেশি) আছে তার সিংহভাগই বিজয়নগর সাম্রাজ্যের রাজাদের হাতে তৈরি, তাঁদের রাজধানীরই ধ্বংসাবশেষ। ৪০ বর্গ কিমি এলাকা জুড়ে বিস্তৃত হাম্পির এই প্রত্নস্থল হিন্দু ঐতিহ্যের প্রভাবে প্রভাবিত নির্মাণ হলেও সারসানীয় রীতির প্রভাব বাদ যায়নি। ভারতের গৌরবময় ইতিহাস, শিল্প, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত সাক্ষ্য হিসাবে হাম্পি ভারতের অন্যতম প্রধান ও আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
রামায়ন ও মহাভারতের পৌরাণিক কাহীনির সাথে জড়িত হাম্পি শহর। বানর রাজ্য কিস্কিন্ধ্যা ছিল এই হাম্পি ও তার আশেপাশের এলাকা। হাম্পি নামটি এসেছে পম্পা দেবীর নাম থেকে। ব্রহ্মার কন্যা পার্বতী বা পম্পার সাথে বিয়ে করার আগে শিব হাম্পির হেমকূট পাহাড়ে ধ্যান করেছিলেন এবং কামদেব শিবকে পম্পা দেবীর সাথে দেওয়ার জন্য শিবের ধ্যান ভেঙ্গেছিলেন বলে শিব কামদেবকে তার তৃতীয় নয়ন দিয়ে ভস্মিভূত করেছিলেন।
পৌরাণিক গুরুত্বের তুলনায় হাম্পির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অধিক। দক্ষিণের প্রায় সব বড় রাজবংশই এই অঞ্চলকে নিজেদের করায়ত্ত করেছিল। বাদামির চালুক্য বংশ, রাষ্ট্রকূট বংশ, কল্যাণের চালুক্য, হয়সালস থেকে দেবগিরির যাদব বংশ এখানে রাজত্ব করে এবং তাঁদের রাজত্বের কিছু ধ্বংসাবশেষ এখনও হাম্পিতে খুঁজে পাওয়া যায়। তবে হাম্পি রূপে-গুণে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের সময়ে। ত্রয়োদশ শতকে সঙ্গম বংশের দুই ভাই হরিহর ও বুক্ক নিজেদের পেশিবলে বিজয়নগর গড়ে তোলেন আর সেই সাম্রাজ্যের রাজধানী হয় হাম্পি। বিজয়নগর সাম্রাজ্যে আগত বিদেশী পর্যটকগন হাম্পি শহরের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বিভিন্ন সময়ে হাম্পি দেখতে এসেছিলেন ফিরিস্তা, আবদুল রাজ্জাক, নুনিজ, ইবন বতুতা, বারবোসার মতো ভূ-পর্যটকরা। পুরো শহর সাজানো ছিল বাজার, মন্দির, গোপুরম, হস্তিশালা, জলাশয় দিয়ে। বলা হত চিনের বেজিংয়ের পরেই সবচেয়ে সাজানো শহর ছিল হাম্পি। ১৫ শতকের পর্যটক তথা পারস্যের রাষ্ট্রদূত আব্দুর রাজ্জাক লিখেছে নগর রূপে হাম্পি অতুলনীয় এবং ঐশ্বর্যে পরিপূর্ণ, এখানকার নাগরিকদের গোলাপ ফুল খুব প্রিয়। ১৬ শতকে আগত পর্তুগীজ পর্যটক ডোমিঙ্গো পায়েজ একইভাবে হাম্পি নগরীর প্রশংশায় পঞ্চমূখ। প্রতিবেশী বাহমনি রাজ্যের সঙ্গে বিজয়নগরের অবিরাম সংঘাত চলত এবং এই সংঘাতের ফলেই বিজয়নগর সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়। বাহমনী রাজ্য ধ্বংস হয়ে গেলেও তার ধওংসস্তুপের উপর গড়ে ওঠা বিজাপুর, গোলকুন্ডা, আহম্মদনগর ও বিদর রাজ্যের যৌথ আক্রমণে ১৫৫৬-এর তালিকোটার যুদ্ধে বিজয়নগর পরাজিত হয় এবং বাহমনি সুলতানের বাহিনী হাম্পিতে লুণ্ঠন চালায়। এভাবে হাম্পির গৌরব ধ্বংস হয়।
হাম্পির আসল সৌন্দর্য এর স্থাপত্যকলা ও ভাস্কর্য শিল্পে। হাম্পির নির্মাণগুলি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সাংস্কৃতিক মিশ্রণের প্রতিচ্ছবি। তিনটি প্রধান স্থাপত্য মিশ্রিত হয়েছে এখানে-- দ্রাবিড়, ইন্দো-ইসলামিক এবং বিজয়নগরের নিজস্ব শৈলী। দ্রাবিড় স্থাপত্যের প্রধান উপাদান বিশালাকার কাঠামো, বিচ্ছিন্ন আবেষ্টনী, ভাস্কর্য-অলংকরণে সমৃদ্ধ প্রাচীর, উচ্চ টাওয়ার এবং অলংকরণময় স্তম্ভ দ্বারা বেষ্টিত প্রবেশপথ। দ্রাবিড়-শৈলীর স্থাপত্যের চিরাচরিত উদাহরণের মধ্যে রয়েছে বিরূপাক্ষ মন্দির ও বিঠঠল মন্দির। ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্য চেনা যায় প্রতিসম খিলান ও গম্বুজ এবং আলংকারিক প্যানেলিং দ্বারা। লোটাস মহল ও হাতির আস্তাবলে এর প্রতিফলন দেখা যায়। বিজয়নগর স্থাপত্যে রয়েছে অলংকৃত মন্দির, বিস্তারিত স্তম্ভযুক্ত ম্যারেজ হল (কল্যাণ মণ্ডপ), ভাস্কর্যযুক্ত প্রবেশদ্বার (গোপুরম), একশিলা মূর্তি, গ্রানাইটের ব্যবহার এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত জল সংরক্ষণ ও সেচ কাঠামো—যেমন জলাশয় ও জলপ্রণালী, যা বিজয়নগরের প্রতিষ্ঠাতা শাসক বুক্কার শাসন কালে নির্মিত হয়েছিল। বিজয়নগর স্থাপত্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো হাজার রাম মন্দির ও লক্ষ্মী নৃসিংহ মূর্তি।
হাম্পির প্রত্নস্থলকে মোটামুটি তিনটি পৃথক এলাকায় ভাগ করা যায়ঃ ১. পবিত্র এলাকা (The Sacred Zone), 2. সুরক্ষিত রাজকীয় এলাকা এবং ৩. মুল বসতি এলাকা।
Sacred Zone-এর মধ্যে পড়ে বিরূপাক্ষ মন্দির ও বিঠঠল মন্দির। বিরূপাক্ষ মন্দিরটি খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকে নির্মিত একটি শিব মন্দির। এখানে আজও পুজা হয়। এর মন্ডপম (স্তম্ভ যুক্ত হল) এবং ছাদে চিত্রিত হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীর চিত্র সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই মন্দিরে শিবের বাহন নন্দীর একটি বিরাট মূর্তি আছে। বিঠঠল স্বামীর মন্দির ১৫ শতকে নির্মিত। এর প্রধান আকর্ষণ এর ৫৬ টি মিউজিক্যাল পিলার যেগুলি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রথম ৪টি স্বর সা, রে, গা, মা -এর নামে নামকরণ করা। কাঠামোটিতে একাধিক বড় স্তম্ভ রয়েছে, যেগুলির প্রতিটিতে সাতটি সহায়ক স্তম্ভের একটি বলয় দ্বারা বেষ্টিত। এই ছোট স্তম্ভগুলি ধ্বনিগতভাবে সুরকরণ করা, যার প্রতিটি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি স্বতন্ত্র স্বরের সঙ্গে অনুরণিত বলে বিশ্বাস করা হয়। মন্দিরের সামনে রাখা গরুড় রথটি যথেষ্ট আকর্ষণীয়। মন্দিরের বাইরে রয়েছে বিরাট বিঠঠল বাজার। এছাড়াও হাম্পির বিভিন্ন স্থানে একাধিক ধর্মীয় উপাসনাগৃহ রয়েছে, যার বেশিরভাগটাই হিন্দু মন্দির। হেমকূট পাহাড়ে নির্মিত ৩৫টির বেশি মন্দির রয়েছে,যেগুলি বেশিরভাগই শিবকে উৎসর্গীকৃত। এছাড়া রয়েছে ১৩৮৬ সালে নির্মিত ১৭তম জৈন তীর্থঙ্কর কুনথুনাথকে উৎসর্গ করা একটি মন্দির এবং বিজয়নগরের উচ্চপদস্ত কর্মচারী আহম্মদ খান নির্মিত (১৪৩৯) একটি জামাতঘর, যা বর্তমানে আহম্মদ খান মসজিদ নামে পরিচিত।
রাজকীয় এলাকার মধ্যে রয়েছে রাণীদের স্নানাগার, যেটি ১৬ শতাব্দীতে বিজয়নগরের রাজা অচ্যুত দেব রায় রাজ পরিবারের মহিলাদের স্নান করার জন্য নির্মাণ করেছিলেন। এর কাঠামোটি বর্গাকার এবং প্রবেশপথে পাঁচটি সারিবদ্ধ খিলানের রয়েছে। অভ্যন্তর ভাগে খোলা আকাশের নিচে একটি কেন্দ্রীয় জলাশয় রয়েছে এবং তাকে ঘিরে রয়েছে সূচগ্র খিলানের করিডোর, ঝুলন্ত বারান্দা ও গম্বুজ। লোটাস মহল (কামাল মহল বা চিত্রাঙ্গিনি মহল নামেও পরিচিত) নির্মিত হয়েছিল ১৬ শতাব্দীতে। এটি রাজ পরিবারের মহিলাদের অবসর বিনোদনের জায়গা। এটি একটি দোতলা প্যাভেলিয়ান যার গম্বুজ অর্ধ প্রস্ফুটিত পদ্মকুঁড়ির মত। এছাড়া রয়েছে একটি হাতির আস্তাবল। বড় বড় পাথরের ব্লক দিয়ে নির্মিত এই আস্তাবলের বাইরের দেয়ালে হাতিদের দৃশ্য খোদাই করা রয়েছে।
বসতি এলাকায় আকর্ষণীয় হল ভগবান রামকে উৎসর্গ করা বিখ্যাত পট্টভিরাম মন্দির এবং রাজধানীতে প্রবেশের অন্যতম প্রধান পথ তালারিগাট্টা গেট। সম্ভবত এটি টোল গেট। আনেগুন্ডি বসতি এলাকাটি প্রায় ৩ হাজার বছর পুরানো। খ্রিস্টপূর্ব দশম শতাব্দীতে এখানকার বসতির প্রমাণ রয়েছে এবং রামায়ণেও এই বসতির উল্লেখ আছে।
ইউনেস্কো হাম্পির ঐতিহ্যের গুরুত্ব উপলব্ধি করে Criteria I, III ও IV-এর ভিত্তিতে ১৯৮৬ সালে হাম্পিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। Criteria I -- পরিকল্পিত ও সুরক্ষিত হাম্পি শহর, তার মন্দির স্থাপত্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশের অসাধারণ মিলন এক অনন্য শিল্পসৃষ্টি; Criteria III-- বিজয়নগর সাম্রাজ্যের বিলুপ্ত সভ্যতার ব্যতিক্রমী সাক্ষ্য; Criteria IV-- তালিকোটার যুদ্ধের পরও টিকে থাকা মন্দির, রাজকীয়, বেসামরিক ও সামরিক কাঠামোর অসামান্য উদাহরণ।
১৯৬০-এর দশক থেকে হাম্পি ধীরে ধীরে offbeat tourist spot হিসাবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। সেই সময় হাম্পির পর্যটন পরিকাঠামো যথেষ্ট উন্নত ছিল না। তবুও বিভিন্ন দল হাম্পির পাহাড় ও প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের আশেপাশে সমবেত হয়ে উৎসব, বিনোদন এবং আধ্যাত্মিক সাধনার আয়োজন করত। এই ধরনের পর্যটকদের অনেক সময় Hampi Hippies নামে অভিহিত করা হয়েছে। এখন প্রতি বছর প্রায় ৭ লক্ষেরও বেশি পর্যটক হাম্পি পরিদর্শন করেন। হাম্পির পর্যটন-সংস্কৃতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ হল বার্ষিক হাম্পি উৎসব বা বিজয়া উৎসব। বিজয়নগর সাম্রাজ্যের সময় থেকেই এই উৎসবের ঐতিহ্য চলে আসছে। বর্তমানে কর্ণাটক সরকার এই উৎসবকে নাদ হাব্বা বা রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী উৎসব হিসেবে আয়োজন করে। উৎসবের মাধ্যমে হাম্পির ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, শিল্প, সংস্কৃতি ও লোকপরম্পরাকে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরা হয়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন