সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ভিমবেটকার গুহাবাস | Rock Shelter of Bhimbetka

ভীমবেটকার গুহাবাস | Rock Shelter of Bhimbetka

মধ্যপ্রদেশের ভোপাল শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণপূর্বে হোসাঙ্গাবাদের পথে এবং ওবেইদুল্লাগঞ্জ শহর থেকে মাত্র ৯ কিমি দূরে বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণ ঢালে রাইসেন জেলায় অবস্থিত ভীমবেটকার প্রত্নক্ষেত্র। ভীমবেটকায় প্রাগৈতিহাসিক যুগের আদিম মানুষের গুহাবাসের প্রমান পাওয়া গেছে, যার সূচনা পুরাপ্রস্তর যুগের অ্যাসুলিয় পর্বে। ভীমবেটকায় পুরাপ্রস্তর যুগ, মধ্যপ্রস্তর যুগ এমনকি তার পরেও ধারাবাহিক গুহাবাসের প্রমান রয়েছে। প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ৩ কিলোমিটার প্রশস্ত এই প্রত্নস্থলটিতে ৭০০-রও বেশি গুহাবাস রয়েছে, যার মধ্যে ৪০০-রও বেশি গুহাবাসে প্রস্তরযুগীয় গুহাচিত্র পাওয়া গেছে। ভীমবেটকার প্রত্নক্ষেত্র কেবল প্রাচীনতম মানববসতির নিদর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এখানকার গুহাচিত্র, প্রস্তরায়ুধ এবং বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন প্রাগৈতিহাসিক মানুষের জীবনযাত্রা, শিল্পচেতনা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের ধারাবাহিকতার পরিচায়ক। তাই ভীমবেটকা একই সাথে প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য, ভারতের প্রাক-ইতিহাস এবং ঐতিহাসিক পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়।

ভীমবেটকা-- এই নাম বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যাবে দুটি শব্দ- ভীম ও বেটকা। অর্থাৎ, ভীমবেটকার অর্থ দাঁড়ায় ভীমের বিশ্রামস্থল। প্রচলিত স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, বনবাসের সময় মহাভারতের ভীম এখানে বিশ্রাম নিতেন এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন। উনি এখানে মাতা বৈষ্ণবীর পূজা করেছিলেন এবং আসন্ন যুদ্ধজয়ের জন্য তাঁর আশীর্বাদ লাভ করেছিলেন। তাই এখানে একটি মাতা বৈষ্ণবী মন্দিরও রয়েছে।

জনৈক ব্রিটিশ অফিশিয়াল W. Kincaid প্রথম ১৮৮৮ সালে তাঁর একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধে প্রথম ভীমবেটকার কথা উল্লেখ করেন। তিনি স্থানীয় আদিবাসীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ভীমবেটকাকে একটি বৌদ্ধ স্থল (Buddhist Site) হিসাবে চিহ্নিত করেন। কিন্তু প্রত্নতত্ত্ববিদ V. S. Wakankar ১৯৫৭ সালে ভীমবেটকার কয়েকটি গুহা পরিদর্শন করে এর সাথে স্পেন ও ফ্রান্সের আদিম গুহাবাসের সাথে তুলনা করেন। তবে ১৯৭০ এর দশক থেকে ভীমবেটকায় বিস্তৃত অনুসন্ধান হয় এবং এর প্রাচীন ঐতিহ্য ও ইতিহাস অনাবৃত হয়। প্রত্নস্থলটি ১৯৯০ সালে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষিত হয় এবং এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (ASI)-এর হাতে ন্যস্ত হয়। পরবর্তীকালে ২০০৩ সালে ইউনেস্কো (UNESCO) মানদন্ড-III (long interaction between people and the landscape) এবং মানদন্ড-V (closely associated with a hunting and gathering economy) এর ভিত্তিতে ভীমবেটকাকে বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল (World Heritage Site) হিসেবে ঘোষণা করে।

প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের ফলে ভীমবেটকায় নিম্ন পুরাপ্রস্তর যুগ থেকে শুরু মধ্যপ্রস্তর যুগ পর্যন্ত প্রস্তরায়ুধের অবশেষ পাওয়া গেছে। নিম্ন পুরাপ্রস্তর যুগীয় বৃহদাশ্মীয় আয়ুধ হাতকুঠার, মধ্য পুরাপ্রস্তর যুগের অপেক্ষাকৃত ছোটো আকারের আয়ুধ স্ক্র্যাপার, উচ্চ পুরাপ্রস্তর যুগের ব্লেড, বোরার ও বুরিন পাওয়া গেছে। মধ্যপ্রস্তর যুগের ব্লেড, ত্রিভুজাকৃতি আয়ুধ, অর্ধচন্দ্রাকৃতি আয়ুধ ও মুলার পাওয়া গেছে, যেগুলির বেশিরভাগ নির্মিত হয়েছিল চ্যালসেডনি পাথর দিয়ে। মধ্যপ্রস্তর যুগের স্তরে তাম্রপ্রস্তর যুগের মৃৎপাত্রও পাওয়া গেছে। অনুমান করা হয় প্রারম্ভিক ঐতিহাসিক যুগে বাইরের সংস্কৃতির সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয়। 

পর্যটকদের কাছে ভীমবেটকার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর গুহাচিত্রগুলি। ভীমবেটকা ক্লাস্টারের অডিটোরিয়াম রক শেল্টার, জু রক শেল্টার এবং বোয়ার রক শেল্টার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে দৈনন্দিন জীবনযাপনের প্রমান ছাড়াও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের নিদর্শন রয়েছে। অডিটোরিয়াম রক শেল্টারের শেষ প্রান্তে খোদাই করা ছোট ছোট পেয়ালার মত গর্ত রয়েছে। এগুলির সময়কাল প্রায় ১,০০,০০০ বছর পূর্বের বলে অনুমান করা হয়। এই সুড়ঙ্গের শেষের দিকে একটি চিত্রগুচ্ছ দেখা যায়, যেখানে রয়েছে একজন শিকারি, হরিণ, বাঘ, গবাদি পশু এবং শৈল্পিকভাবে অঙ্কিত ময়ূরের চিত্র। একই পথ ধরে আরও এগিয়ে গেলে জু রক শেল্টার-এর দেখা মেলে। এখানে নিবিড় চিত্রাঙ্কন লক্ষনীয়। এখানকার চিত্রগুলির সময়কাল মধ্যপ্রস্তর যুগ থেকে ঐতিহাসিক যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই চিত্রগুলির মধ্যে রয়েছে গাঢ় লাল রঙে আঁকা মধ্যপ্রস্তরযুগীয় বুনো শূকর এবং অন্যান্য প্রাণীর চিত্র, যেমন- হাতি, গণ্ডার,, বারাসিংহা, চিতল হরিণ, গবাদি পশু ও সাপ। পরবর্তী পর্যায়ের চিত্রগুলির মধ্যে লাল রঙে আঁকা যুদ্ধের দৃশ্য এবং সাদা রঙে আঁকা একটি হাতির চিত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর পর বোয়ার রক-এ একটি শিংযুক্ত এই বিশালাকৃতির শূকর, যা কাল্পনিক এবং একে পিছা করা মানুষটির তুলনায় এটি বহুগুণ বড়। 

মূলত নভেম্বর থেকে মার্চ মাসের শীতল মনোরম আবহাওয়ায় এখানে দেশ-বিদেশের বহু ইতিহাসপ্রেমী পর্যটকের আগমন ঘটে। ৭০০ টি গুহাবাসের মধ্যে মাত্র ১৫-টি গুহা পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত।  ভীমবেটকায় প্রতি বছর কত পরিমান পর্যটক হাজির হয় তার কোনো অফিসিয়াল তথ্য নেই। তবে ২০১৪ সালের মীনাক্ষি দুবে পাঠকের একটি হিসাব (Adoranten, 2014) থেকে জানা যায় প্রতি বছর প্রায় ৪০,০০০ পর্যটক এখানে ভ্রমন করেন। কতজন বিদেশী পর্যটক আসেন তারও কোনো হিসাব নেই। তবে টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় অঙ্কুর শিরোথিয়ার একটি প্রতিবেদনে (২৮ অক্টোঃ, ২০১৭) মধ্যপ্রদেশের বিদেশী পর্যটক কমে যাওয়া প্রসঙ্গে ওঠে এসেছে যে খাজুরাহ বা সাঁচির তুলনায় ভীমবেটকায় বিদেশী ট্যুরিস্ট বেশি আসে। 

পরিশেষে মধ্যপ্রদেশে বহু ঐতিহাসিক পর্যটনের  ক্ষেত্র অবস্থিত। একেবারে প্রচীনতম অতীত থেকে শুরু করে সাম্প্রতীক অতীত পর্যন্ত ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করছে এই রাজ্য। ভিমবেটকা তাঁরই মধ্যে প্রধানতম। ভীমবেটকা সহ অন্যান্য প্রত্নক্ষেত্র এবং ঐতিহাসিক স্থলগুলির পর্যটন সম্ভাবনার জন্য গবেষক, হেরিটেজ ও ট্যুরিজম সম্পর্কিত বিভিন্ন সংস্থা এবং  সরকারকে মনোযোগ দেওয়া দরকার। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আরবদের সিন্ধু অভিযানঃ প্রত্যক্ষ কারণ ও তাৎপর্য | Arab Conquest of Sindh: Immediate Causes and Significance

আরবদের সিন্ধু অভিযানঃ প্রত্যক্ষ কারণ ও তাৎপর্য সপ্তম শতকের প্রথমার্ধে আরবদেশে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। ইসলাম আরবদের নতুন করে জীবনীশক্তির সঞ্চার করে । ইসলাম ক্রমশ: একটি ধর্ম থেকে রাজনৈতিক শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় তারা আরবীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ভারতবর্ষের সঙ্গে আরবদের যোগাযোগ দীর্ঘদিনের। বাণিজ্যিক সূত্রে তারা নিয়মিত ভারতের উপকূল গুলিতে, বিশেষ করে মালাবার উপকূলে আসত। ভারতীয় ও চীনা পণ্য 'ধাও' নামক বিশেষ জাহাজে করে নিয়ে তারা ইউরোপের বাজারে বিক্রি করত। 712 খ্রিস্টাব্দে ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এর সেনাপতি ও জামাতা মোহাম্মদ বিন কাসেম সিন্ধু দেশে একটি সফল অভিযান করেন এবং সিন্ধুদেশ আরবীয় মুসলমানদের অধীনে চলে যায়। অভিযানের(প্রত্যক্ষ) কারণ ভারতবর্ষের প্রতি আরবদের দীর্ঘদিনের নজর ছিল। এর আগেও বহুবার ভারতের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পাঠানো হয়েছিল। তবে এই(712 খৃ:) অভিযানের একটি প্রত্যক্ষ কারণ ছিল। জানা যায় যে সিংহলের রাজা ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কে কয়েকটি জাহাজে করে উপঢৌকন পাঠাচ্ছিলেন কিন্তু পথে সিন্ধু দেশের জলদস্যুরা দেবল বন্দরে এ...

মহাফেজখানার শ্রেণীবিভাগ | Category of Archives

মহাফেজখানার শ্রেণীবিভাগ মহাফেজখানা বা লেখ্যাগারগুলি সাধারণ জনতার জন্য নয় মূলত গবেষক, ঐতিহাসিক, আইনবিদ, চিত্র পরিচালক প্রভৃতি পেশার লোকজন তাদের গবেষণার কাজে লেখ্যাগারে নথি পত্র দেখতে পারেন।  লেখ্যাগার পরিচালনা ও সংরক্ষিত নথির ভিত্তিতে লেখ্যাগগুলিকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়েছে।   1. সরকারি লেখ্যাগার:- কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার বা স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে যে লেখ্যাগারগুলি গড়ে ওঠে। সেগুলিকে সরকারি লেখ্যাগার বলা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এরকম সরকার পরিচালিত এক বা একাধিক লেখ্যাগার থাকে। যেমন, আমেরিকার Natonal Archive And records Administration (NARA)। ভারতবর্ষে র কেন্দ্রীয় লেখ্যাগার National Archive of India নামে পরিচিত। বিভিন্ন ঐতিহাসিক, প্রশাসনিক ও আইনগত নথি, মানচিত্র, নক্সা,  পাণ্ডুলিপি প্রভৃতি সংরক্ষিত থাকে। 2. বানিজ্যিক লেখ্যাগার:-  এটি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানের লেখ্যাগার বিভিন্ন বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান   মূলত তাদের সংস্থার ঐতিহাসিক এবং বানিজ্যিক নথি সংরক্ষিত রাখে। যেমন, ভারতের প্রথম বানিজ্যিক লেখ্যাগার হলো পুনার Tata Centrel Archive। 3. অলাভজনক লেখ্যাগ...

ষোড়শ শতকীয় ইউরোপে মূল্যবিপ্লব | Price Revolution

 ষোড়শ শতকের ইউরোপে মূল্য বিপ্লব   16 শতাব্দীতে ইউরোপীয় অর্থনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো মূল্য বিপ্লব। নিত্যব্যবহার্য পণ্যের মূল্য প্রায় 150 বছর সুস্থির থাকার পর ঊর্ধ্বমুখী হতে আরম্ভ করে, এবং 16 শতাব্দীর শেষে খাদ্যপণ্যের মূল্যের প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। পশ্চিম ইউরোপের অর্থনীতিতে এমন অভাবনীয় এবং সুদুরপ্রসারী ফলাফলসম্পন্ন ঘটনা মূল্য বিপ্লব নামে পরিচিত। মূল্য বিপ্লবের কতগুলি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যথা--    (১) কৃষিজ পণ্যের তুলনায় শিল্পজাত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি ছিল কম, এবং খাদ্যশস্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। (২) ভূমি রাজস্ব সহ ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক, তোলা ইত্যাদির হার বৃদ্ধি এবং ফটকাবাজির আবির্ভাব। (৩) মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় মজুরির হার খুবই কম ছিল বলে প্রকৃত আয় হ্রাস পেয়েছিল। (৪) ভূমি বিক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত হওয়া। (৫) গ্রামীণ বুর্জোয়াজি শ্রেণীর আবির্ভাব। ষোড়শ শতকের আগেও প্রাকৃতিক কারণে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল, তবে তা ছিল 2, 3 শতাংশের মতো, যা অস্বাভাবিক মনে হতো না। কিন্তু ষোল শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে যে নিরবিচ্ছিন্ন মূল্যবৃদ্ধি হ...