ঐতিহ্যবাহী স্থান এবং ঐতিহাসিক পর্যটনস্থল হিসেবে ইলোরা গুহার গুরুত্ব | The Importance of the Ellora Caves as a Heritage Site and Historical Tourism Destination
ঐতিহ্যবাহী স্থান এবং ঐতিহাসিক পর্যটন স্থল হিসেবে ইলোরা গুহার গুরুত্ব
মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদ শহরের (পরিবর্তিত নাম ছত্রপতি সাম্ভাজিনগর ) প্রায় ৩০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে চালিসগাঁও যাওয়ার পথে অবস্থিত ইলোরা গুহা ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্যবাহী স্থান। এর স্থানীয় নাম ভেরুল লেণি। ইলোরায় প্রায় ২ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যাসল্ট পাথরের পাহাড় খাড়াভাবে কেটে পাশাপাশি ৩৪টি মঠ ও মন্দির নির্মিত হয়েছে। সম্ভবত স্থপতিরা পাথরের প্রাকৃতিক স্তর ও খাঁজগুলিকে কাজে লাগিয়ে খননকার্য সহজ করেছিলেন। এই গুহাগুলোর নির্মাণ আনুমানিক ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে সম্পন্ন হয়েছিল। ইলোরার বিশেষত্ব শুধু এর প্রাচীনত্বে নয়, একই স্থানে বৌদ্ধ, ব্রাহ্মণ্য এবং জৈন ধর্মের মঠ ও উপাসনালয় পাশাপাশি অবস্থান করছে। ইলোরা প্রাচীন ভারতের শিল্প, স্থাপত্য, ধর্মীয় সহাবস্থান, প্রযুক্তি ও সামাজিক ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। UNESCO-র ভাষায়, এটি একদিকে অনন্য শিল্পসৃষ্টি ও অসাধারণ প্রযুক্তিগত কীর্তি, অন্যদিকে প্রাচীন ভারতের ধর্মীয় সহনশীলতার প্রতীক।
প্রত্নতাত্বিক প্রমানের ভিত্তিতে ইলোরার নির্মাণকে তিনটি প্রধান পর্যায়ে ভাগ করা যায়; প্রথম পর্যায়ে বৌদ্ধ গুহা, দ্বিতীয় পর্যায়ে ব্রাহ্মণ্য গুহা এবং শেষ পর্যায়ে জৈন গুহা নির্মিত হয়েছিল। চালুক্য রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রথম পর্যায়ে ১ থেকে ১২ নম্বর গুহাগুলির নির্মাণ মূলত ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শতাব্দীর মধ্যে হয়েছিল। পরবর্তীকালে রাষ্ট্রকুটরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এগুলিতে মহাযান এবং পরবর্তী সময়ে বজ্রযান ধারার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। প্রাচীনতম বৌদ্ধ গুহা হল গুহা নম্বর ৬ এবং সবথেকে নবীনতম হল ১১ ও ১২। ষষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে অষ্টম শতকের শেষ লগ্ন পর্যন্ত সময়ে ব্রাহ্মণ্য গুহাগুলি (১৭-২৯) দুটি পর্যায়ে নির্মিত হয়েছিল কলচুরি শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং পরবর্তী কালে অষ্টম থেকে দশম শতকের মধ্যে রাষ্ট্রকূট রাজাদের উদ্যোগে ১৪, ১৫, ১৬ নম্বর গুহা নির্মিত হয়। বিখ্যাত ১৬ নম্বর গুহা অর্থাৎ কৈলাসনাথ মন্দির নির্মাণে রাজা প্রথম কৃষ্ণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা জানা যায়। জৈন গুহাগুলি (৩০-৩৪) নির্মিত হয়েছিল নবম থেকে দশম শতকের মধ্যে। এগুলি মুলত দিগম্বর জৈনদের গুহা। এগুলির নির্মাণ কাদের পৃষ্ঠপোষকতায় হয়েছিল তার তথ্য পাওয়া যায় নি। তবে, ঐ এলাকা এই সময় কল্যান শাখার চালুক্য রাজারা এবং দেবগিরির যাদব শাসকেরা নিয়ন্ত্রণ করেছিল।
১২টির মধ্যে ১১টি গুহা বিহার হিসেবে ব্যবহৃত হত, যেখানে বসবাসের কক্ষের পাশাপাশি গৌতম বুদ্ধ ও অন্যান্য দেব-দেবীর ভাস্কর্য খোদাই করা রয়েছে। এর মধ্যে ৫ নম্বর গুহাটি স্থাপত্যের দিক থেকে অনন্য, কারণ এর মাঝখানে মুখোমুখি দুটি বেঞ্চ এবং পেছনে বুদ্ধ মূর্তি রয়েছে। বিখ্যাত ১০ নম্বর গুহাটি বিশ্বকর্মা গুহা বা Carpenter Cave নামে পরিচিত, যা একমাত্র চৈত্য। এর খিলানযুক্ত পাথরের ছাদকে কাঠের বিমের মতো রূপ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, ২-তলা বিশিষ্ট ১১ নম্বর গুহা এবং ৩-তলা বিশিষ্ট ১২ নম্বর গুহায় প্রচুর বজ্রযান প্রতীক, দেব-দেবী ও মণ্ডলের চিত্র রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে অষ্টম শতাব্দীর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় তান্ত্রিক ও বজ্রযান বৌদ্ধধর্ম সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল।
ব্রাহ্মণ্য গুহাগুলির শৈল্পিক সৌন্দর্য প্রতিফলিত হচ্ছে শিব, পার্বতী এবং বিষ্ণুর মত দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত সূক্ষ্ম রক-কাট ভাস্কর্যের মাধ্যমে। ২৯ নম্বর গুহায় প্রাকৃতিক ঝরনা 'ভালে গঙ্গা'-কে স্থাপত্যের সাথে এমনভাবে যুক্ত করা হয়েছে, যা দেখে মনে হয় ঝরনাটি শিবের ললাট থেকে প্রবাহিত হচ্ছে। ২১ নম্বর গুহার প্রবেশদ্বারে দেবী গঙ্গা ও যমুনার বিশাল ও দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য রয়েছে। এই ২১ নম্বর গুহার রক-কাট ভাস্কর্যগুলিতে শিব ও পার্বতীর প্রেম, বিবাহ, অবসর সময় এবং শিবের আনন্দনৃত্যের মত রোজকার জীবনের নানা মুহূর্ত দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তাছাড়া নিখুঁত জ্যামিতিক নিয়মে মন্দিরের গর্ভগৃহ, শিবলিঙ্গ ও দেবীমূর্তিগুলি স্থাপন করে ২১ নম্বর গুহায় সামঞ্জস্যপূর্ণ রূপ দেওয়া হয়েছে। ১৬ নম্বর গুহার বিশাল কৈলাশ মন্দির একশিলা বিশিষ্ট মন্দিরের অনন্য কীর্তি, যা একটি সম্পূর্ণ বহুতলবিশিষ্ট স্বতন্ত্র মন্দির প্রাঙ্গন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। কৈলাশ মন্দিরের দেয়ালে ভারতের দুই মহাকাব্য 'রামায়ণ' ও 'মহাভারত'-এর নানা দৃশ্য খুঁটিনাটি রিলিফ ভাস্কর্যের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই মন্দিরে বিষ্ণুর অবতার, ইন্দ্র ও অগ্নির মতো বৈদিক দেবতা এবং অন্যান্য অ-বৈদিক দেব-দেবীর নানাবিধ ভাস্কর্যও রয়েছে।
জৈন গুহাগুলির কারুকার্য অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও নিখুঁত। এই গুহাগুলির বিশেষত্ব এর অলঙ্কৃত স্তম্ভ, ছাদে খোদাই করা বিশাল ফুটন্ত পদ্মের নকশা এবং চমৎকার বহুতল স্থাপত্য। এই শিল্পকলার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ২৪ জন তীর্থঙ্করের (বিশেষ করে মহাবীর, পার্শ্বনাথ এবং বাহুবলী) শান্ত-সমাহিত মূর্তি, যা রক্ষক যক্ষ ও যক্ষীদের সাথে গুহাগাত্রে খোদাই করা হয়েছে। গুহাগুলির দেওয়ালে দিব্য উৎসবের আনন্দময় দৃশ্যও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যেখানে দেবরাজ ইন্দ্রকে মুকুট পরিহিত অবস্থায় বাদ্যযন্ত্র বাজানো দেবদূতের ঘেরাটোপে নৃত্যরত রূপে দেখা যায়।
ইলোরায় তিন ধর্মীয় মতাদর্শের সহাবস্থান ও সমন্বয় পৃথিবীর অন্যত্র পাওয়া দুস্কর। এই চিত্র প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সমন্বয় ও পরধর্মসহিষ্ণুতার ঐতিহ্যকে বহন করে। ইলোরা গুহা ১৯৮৩ সালে UNESCO-র বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। UNESCO-র বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতির পরীক্ষার যে তিনটি মানদন্ডে উত্তীর্ণ হয়েছে তার মধ্যে একটি মানদণ্ড (Criterion VI) হল ধর্মীয় সহনশীলতার প্রতীক। এছাড়া আরও দুটি হল অনন্য শৈল্পিক কৃতিত্ব এবং মানবীয় সৃজনশীল প্রতিভার এক অনন্য নিদর্শন (Criterion I) এবং নিরবচ্ছিন্ন ধারাক্রমের মাধ্যমে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতাকে পুনরায় জীবন্ত করে তোলা (Criterion-III)
ইলোরা ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র। ইলোরায় পর্যটকদের কাছে অতীত যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। একজন পর্যটক শুধু স্থাপত্য দেখেই থেমে থাকে না; সে প্রাচীন ভারতের ধর্মীয় জীবন, কারিগরি দক্ষতা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য ইলোরা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, শিল্প-ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব, স্থাপত্য, ভূবিদ্যা, পর্যটনবিদ্যা এবং সংরক্ষণবিজ্ঞানের একটি সমন্বিত ক্ষেত্রসমীক্ষা হতে পারে। ইলোরার আশেপাশে দৌলতাবাদ দুর্গ, বিবি-কা-মকবরা ইত্যাদির মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। ফলে পর্যটকেরা এক সফরেই প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ঐতিহ্যের বহু নিদর্শন দেখতে পারেন। মহারাষ্ট্র পর্যটন বিভাগও ইলোরার অবস্থান, পার্শ্ববর্তী আকর্ষণ এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বকে পর্যটন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তুলে ধরে। অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত আবহাওয়া সাধারণত আরামদায়ক থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে গুহা ঘুরে দেখা সহজ হয়। কিন্তু বর্ষাকালে গুহার প্রকৃত সৌন্দর্য উন্মুক্ত হয়, বিশেষ করে ২৯ নম্বর গুহার প্রাকৃতিক ঝর্নার দৃশ্য। ইলোরা বর্তমানে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এই জনপ্রিয়তা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে অতিরিক্ত পর্যটন ঐতিহ্য রক্ষার ক্ষেত্রে বিপদজনক হতে পারে। গুহার ফাটল ও জল চুঁইয়ে পড়া একটা বড় সমস্যা। ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ বা ASI ইলোরার মূল স্থানটি রক্ষনাবেক্ষন ও পরিচালনা করে এবং বাফার অঞ্চল ASI, বন দপ্তর এবং মহারাষ্ট্র সরকারের সহযোগিতায় পরিচালিত হয়।
পরিশেষে, ঐতিহ্যবাহী স্থান এবং ঐতিহাসিক পর্যটন হিসেবে ইলোরা গুহার গুরুত্ব বহুমাত্রিক। সব মিলিয়ে ইলোরা বিশ্বমানের একটি সাংস্কৃতিক সম্পদ। ইলোরা আমাদের শেখায় যে ধর্মীয় বৈচিত্র্য সংঘাতের কারণ না হয়ে শিল্প, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির সম্মিলিত বিকাশ ঘটাতে পারে। তাই ইলোরা শুধু অতীতের স্মারক নয়; এটি ভারতের বহুত্ববাদ, সৃজনশীলতা ও সহনশীলতার একটি জীবন্ত প্রতীক। এর সংরক্ষণ শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়—পর্যটক, স্থানীয় জনগণ, গবেষক এবং শিক্ষার্থীদেরও এই ঐতিহ্য রক্ষায় সচেতন ভূমিকা নিতে হবে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন