অজন্তা গুহা
এই সময়ের চৈত্যগৃহগুলির কয়েকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল—
- ছাদ সাধারণত খিলানযুক্ত বা বাঁকানো;
- গুহার পিছনের অংশ ছিল অর্ধবৃত্তাকার;
- গুহার সম্মুখভাগে একটি বড় ঘোড়ার খুরের মতো আকৃতির জানালা থাকত, যাকে চৈত্য জানালা বলা হয়;
- ভিতরে সারিবদ্ধ স্তম্ভের মাধ্যমে গুহাকে একটি মধ্যবর্তী প্রধান অংশ এবং দুই পাশের অংশে ভাগ করা হতো;
- দুই পাশের অংশ পিছনের অর্ধবৃত্তাকার অংশের চারপাশে ঘুরে যাওয়ার পথ তৈরি করত, যাতে ভক্তরা স্তূপকে প্রদক্ষিণ করতে পারতেন;
- গুহার পিছনের কেন্দ্রে পাথর কেটে তৈরি চৈত্য বা স্তূপ থাকত। এটিই ছিল উপাসনার প্রধান বিষয়।
এই পর্যায়ের বিহারগুলি ছিল ভিক্ষুদের বসবাস ও সমবেত হওয়ার স্থান। সাধারণত একটি বড় স্তম্ভহীন হল থাকত এবং তার তিন দিকে ছোট ছোট কক্ষ থাকত। এই কক্ষগুলিই ছিল বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বাসস্থান।
দ্বিতীয় পর্যায়ের মহাযান নির্মাণে আগের পর্যায়ের স্থাপত্যরীতি বজায় থাকলেও স্থাপত্য ও ভাস্কর্যে নতুন উদ্যম দেখা যায়। এই সময় গুহার দেওয়ালগুলি অত্যন্ত সুন্দর দেওয়ালচিত্রে সজ্জিত করা হয়। চিত্রগুলি মূলত টেম্পেরা পদ্ধতিতে আঁকা হয়েছিল। একই সঙ্গে স্তম্ভ, স্তম্ভের উপরের অলংকরণ, দরজার চৌকাঠ, উপাসনাকক্ষ এবং গুহার সম্মুখভাগে সমৃদ্ধ ভাস্কর্য ও অলংকরণ যুক্ত করা হয়।
অজন্তার ৫, ২৪ ও ২৯ নম্বর অসম্পূর্ণ গুহা। এগুলি প্রাচীন শিল্পীরা কীভাবে পাথর কেটে গুহা তৈরি করতেন, তার পদ্ধতি ও প্রযুক্তি বোঝার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই অসম্পূর্ণ গুহাগুলি থেকে গুহা নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।
অজন্তার কাঠামোর বাহ্যিক দৃশ্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। একটি অশ্বক্ষুরাকৃতি পাহাড়, যার উচ্চতা ৭৬ মিটার এবং নিচে থেকে একটি সরু জলধারা বয়ে যাচ্ছে। গুহাগুলি থেকে পাথর কেটে সিড়ি নির্মিত আছে যেগুলি নদীতে এসে নামছে। সম্ভবত উপত্যকার নিরিবিলি ও শান্ত পরিবেশ বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য খুব উপযোগী ছিল। বর্ষাকালে তাঁরা বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই নির্জন গুহাগুলিতে আশ্রয় নিতেন। এই সময় তাঁরা ধর্মীয় অনুশীলন, আলোচনা ও বৌদ্ধ দর্শন নিয়ে চিন্তাভাবনা করার সুযোগ পেতেন।
১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে অজন্তা গুহাকে UNESCO-র World Heritage Site এর তকমা দিয়েছে চারটি মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য। সেগুলি হল; মানদন্ড-১: অনন্য শিল্প কীর্তি; মানদন্ড-২ ভারত ও ভারতের বাইরে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার, যেমন জাভা শিল্পের উপর প্রভাব; মানদন্ড-৩ঃ ভারতীয় শিল্পের বিকাশ এবং সাতবাহন ও বাকাটক যুগে বৌদ্ধ ধর্মীয় ও শিক্ষাকেন্দ্রগুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার অসাধারণ প্রমাণ এবং মানদন্ড - ৬ঃ বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি ও গভীরভাবে যুক্ত।
অজন্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র। দেশ-বিদেশের পর্যটকরা এখানকার বৌদ্ধ ঐতিহ্য, প্রাচীন স্থাপত্য এবং অসাধারণ চিত্রকলা দেখার জন্য আসেন। পর্যটনের ফলে স্থানীয় গাইড, পরিবহণকর্মী, হোটেল ও পর্যটনকর্মী, কারুশিল্পী এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে পর্যটন ভারতের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি করে। তবে পর্যটন অবশ্যই দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করতে হবে। অজন্তার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, কার্বন ডাই-অক্সাইড, ধুলিকণা, আলো এবং জীবাণুর বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। সাম্প্রতীক একটি গবেষণায় দেখা গেছে বেশিমাত্রায় পর্যটকের আগমনের ফলে অজন্তায় আদ্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা নির্মাণকে ক্ষতিগ্রিস্ত করছে। তাই অজন্তার ক্ষেত্রে টেকসই পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এর উদ্দেশ্য হবে একদিকে পর্যটকদের অজন্তা দেখার সুযোগ দেওয়া এবং অন্যদিকে এর মূল্যবান শিল্পকর্ম ও ঐতিহ্যকে রক্ষা করা।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন