History of the Emergence and Evolution of Museums in India | ভারতে সংগ্রহশালার গড়ে ওঠা ও বিবর্তনের ইতিহাস
ভারতে সংগ্রহশালার গড়ে ওঠা ও বিবর্তনের ইতিহাস
সংগ্রহশালা কোনো সমাজের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য চর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। মানবসভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ তার অতীতের নিদর্শন, শিল্পকর্ম, প্রাকৃতিক সম্পদ ও জ্ঞানভাণ্ডার সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে। যদিও আধুনিক অর্থে সংগ্রহশালা একটি তুলনামূলকভাবে নবীন ধারণা, তবু ভারতের মতো প্রাচীন সভ্যতায় এর বীজ বহু আগেই নিহিত ছিল। ভারতের সংগ্রহশালার ইতিহাস মূলত সামাজিক, রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত এক দীর্ঘ বিবর্তনমূলক প্রক্রিয়া, যা প্রাচীন সংরক্ষণ চেতনা থেকে শুরু করে আধুনিক যুগে একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ হওয়া পর্যন্ত বিস্তৃত।
প্রাক্–সংগ্রহশালা পর্ব
আধুনিক সংগ্রহশালার পূর্ববর্তী পর্বে ভারতে সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ধারণা মূলত ধর্মীয় ও রাজকীয় পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল। প্রাচীন মন্দির, বৌদ্ধ বিহার ও রাজপ্রাসাদগুলিতে দেবমূর্তি, ভাস্কর্য, পাণ্ডুলিপি, অলংকার ও মূল্যবান দ্রব্য সংরক্ষিত থাকত। দক্ষিণ ভারতের বহু মন্দিরে আজও ধাতু ও পাথরের প্রাচীন মূর্তি সংরক্ষিত রয়েছে, যা সেই সময়কার শিল্প ও কারিগরি দক্ষতার সাক্ষ্য বহন করে। যদিও এই সংরক্ষণ ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত ছিল না এবং কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অন্তর্গত ছিল না, তবু এগুলি পরবর্তী কালে সংগ্রহশালা গঠনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
ঔপনিবেশিক ও কোম্পানি পর্ব
ভারতে আধুনিক সংগ্রহশালার সূচনা ঘটে ব্রিটিশ শাসনকালে। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসনিক বিস্তার এবং ইউরোপীয় পণ্ডিতদের জ্ঞানানুসন্ধিৎসা সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে। ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় স্যার উইলিয়াম জোনসের উদ্যোগে এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা ভারতের সংগ্রহশালার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এশিয়ার ইতিহাস, ভাষা, শিল্প, ভূগোল ও প্রকৃতি সম্পর্কে গবেষণাই ছিল এই প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য। গবেষণার প্রয়োজনে সংগৃহীত বিভিন্ন বস্তু সংরক্ষণের মধ্য দিয়েই আধুনিক সংগ্রহশালার ধারণা গড়ে ওঠে। এই ধারাবাহিকতায় ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ভারতের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক সংগ্রহশালা হিসেবে পরিচিত।
ভিক্টোরীয় যুগ
১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ রাজ প্রতিষ্ঠার পর সংগ্রহশালার বিকাশ আরও সংগঠিত ও পরিকল্পিত রূপ লাভ করে। এই সময়ে প্রত্নতত্ত্ব, প্রাণিবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা ও ভূতত্ত্ব বিষয়ক সংগ্রহে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণ একটি সরকারি দায়িত্বে পরিণত হয়। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে নতুন নতুন সংগ্রহশালা গড়ে ওঠে এবং এগুলি ধীরে ধীরে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হয়। এই পর্বে সংগ্রহশালা কেবল গবেষণার স্থান নয়, বরং শিক্ষার মাধ্যম হিসেবেও গুরুত্ব অর্জন করে। এই পর্বে প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মিউজিয়াম হল ১৮৬৪ সালের লক্ষ্ণৌ ও নাগপুরের মিউজিয়াম, ১৮৬৫ তে ব্যাঙ্গালোর, ১৮৬৭ তে ফৌজাবাদ, ১৮৬৮ তে দিল্লির মিউনিসিপাল মিউজিয়াম প্রভৃতি।
লর্ড কার্জন ও জন মার্শাল যুগ
বিশ শতকের প্রথম ভাগে লর্ড কার্জনের শাসনকাল ভারতের সংগ্রহশালার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় সৃষ্টি করে। প্রত্নতত্ত্ব ও সংরক্ষণকে প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জন মার্শাল আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার ডিরেক্টর জেনারেল হিসেবে নিযুক্ত হয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রবর্তন করেন। মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা সভ্যতার আবিষ্কার ভারতের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে এবং সংগ্রহশালার গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এই পর্বে সংগ্রহশালা গবেষণা, সংরক্ষণ ও জনশিক্ষার সমন্বিত কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়। বারিপদা (১৯০৩), সারনাথ (১৯০৪), যোধপুর (১৯০৯), খাজুরাহ (১৯১০), নালন্দা (১৯১৭) এবং সাঁচি (১৯১৯) এই পর্বের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মিউজিয়াম। এই সময়ে সরকারের নীতি ছিল, প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্র থেকে সংগৃহীত বস্তু সেই স্থানেই তার প্রকৃত পরিবেশের মধ্যেই রেখে চর্চা বা গবেষণা করা। কিন্তু প্রত্নতাত্বিক ক্ষেত্র গুলি এতটাই প্রান্তিক এলকায় অবস্থিত ছিল এবং যাতায়াতের তেমন ব্যবস্থা না থাকায় সেগুলির কয়েকটি নষ্ট হয়ে যেতে থাকে। যেমন- মালদা মিজিয়াম।
প্রাক্–স্বাধীনতা যুগ
১৯২০-এর দশক থেকে ভারতের সংগ্রহশালার উপর জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই সময়ে আঞ্চলিক ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি ও দেশীয় শিল্পের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন প্রাদেশিক সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে উপস্থাপনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে। সংগ্রহশালা আর কেবল ঔপনিবেশিক জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্র রইল না, বরং ভারতীয় সমাজের আত্মপরিচয় নির্মাণের ক্ষেত্র হয়ে উঠল। এই ধরনের মিউজিয়াম গুলি হল আমেদাবাদের ক্যালিকো মিউজিয়াম অফ টেক্সটাইল (১৯৪০), যা ভারতের প্রথম টেক্সটাইল মিউজিয়াম। এটি আমেদাবাদ ক্যালিকো টেক্সটাইল মিলের চেয়ারম্যান গৌতম সারাভাইয়ের অনুপ্রেরনায় এবং ইতিহাসবিদ ড. আনন্দ কুমারস্বামীর উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল। এই পর্বেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ মিউজিয়াম অফ ইন্ডিয়ান আর্ট প্রতিষ্ঠিত হয় (১৯৩৭)।
স্বাধীনতা-উত্তর ও আধুনিক পর্ব
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতের স্বাধীনতার পর সংগ্রহশালার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়। ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে ন্যাশনাল মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি জাতীয় স্তরের সংগ্রহশালা গড়ে ওঠে। পাশাপাশি সালার জং মিউজিয়াম (১৯৫১) সহ বিভিন্ন বিশেষায়িত সংগ্রহশালা জাতীয় গুরুত্ব লাভ করে। এই পর্বে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, লোকশিল্প ও নৃতত্ত্বভিত্তিক সংগ্রহশালার প্রসার ঘটে। ১৯৫৯ সালে CSIR এর পরিচালনায় বিড়লা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্ড টেকনোলোজিক্যাল মিউজিয়াম গড়ে ওঠে। ১৯৭৭ সালে দিল্লিতে ন্যশনাল মিউজিয়াম অফ ম্যান গড়ে ওঠে যা পরবর্তীকালে ইন্দিরা গান্ধি রাষ্ট্রীয় মানব সংগ্রহালয় নামে পরিচিত। সংগ্রহশালার উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে জনশিক্ষা, গবেষণা, সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ ও পর্যটন বিকাশ। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে সংগ্রহশালা আরও গণমুখী ও শিক্ষাবান্ধব রূপ লাভ করে।
উপসংহার
ভারতে সংগ্রহশালার ইতিহাস একটি ধারাবাহিক বিবর্তনের ফল। প্রাচীন ধর্মীয় সংরক্ষণ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে ঔপনিবেশিক গবেষণাকেন্দ্র এবং পরিশেষে আধুনিক জাতীয় প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে সংগ্রহশালা আজ ভারতের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার এক অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। এই বিবর্তন শুধু সংগ্রহশালার নয়, বরং ভারতের সমাজ ও ইতিহাসের পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবিও বহন করে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন