সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

চালুক্য রাজ দ্বিতীয় পুলকেশী | Chalukya King Pulakeshin II

 চালুক্য রাজ দ্বিতীয় পুলকেশী

দ্বিতীয় পুলকেশী ছিলেন দক্ষিণ ভারতের চালুক্য রাজ্যের শ্রেষ্ঠ শাসক। তিনি হর্ষবর্ধনের সমসাময়িক ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক ইতিহাস জানার জন্য তাঁর সভাকবি রবিকীর্তি রচিত আইহোল লিপি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বাদামির (বর্তমানে কর্ণাটকের বিজাপুর জেলায় অবস্থিত) চালুক্য রাজ বংশের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম পুলকেশী (৫৩৫-৫৬৬ খ্রিঃ)। বাদামি দুর্গের প্রতিষ্ঠাতা তিনিই। তাঁর পরবর্তী শাসক ছিলেন মহারাজ প্রথম কীর্তিবর্মণ (৫৬৭-৫৯৮ খ্রিঃ)। তাঁর সময়ে দাক্ষিনাত্যের বিস্তৃত এলাকায় চালুক্যদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী শাসক মঙ্গলেশের (৫৯৮-৬১১ খ্রিঃ) রাজত্বকালের শেষদিকে এক গৃহযুদ্ধ আরম্ভ হয়। গৃহযুদ্ধে জয়ী হয়ে দ্বিতীয় পুলকেশী সিংহাসন আরোহন করেন (৬১১ খ্রীঃ)।  

গৃহযুদ্ধ চলাকালে চালুক্য রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়েছিল। অধীনস্থ নরপতিরা সুযোগ বুঝে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। এদিকে অপ্যায়িকা ও গোবিন্দ নামে দুজন শাসক ভীমা নদীর উত্তর তীর পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে রাজধানীর কাছাকাছি এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। এই অবস্থায় পুলকেশী বৈদেশিক আক্রমণের মোকাবিলা করেন। ভেদনীতি অনুসরণ করে গোবিন্দকে নিজ পক্ষে টেনে দ্বিতীয় শত্রু আপ্যায়িকাকে পরাস্ত করে বিতাড়িত করেন। তিনি অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দমনেও সক্ষম হন। 

প্রাথমিক সমস্যা সমাধানের পর তিনি রাজ্যজয়ে লিপ্ত হন। আইহোল লিপি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায় তিনি কদম্বদের রাজধানী বনবাসী জয় করে তা সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। তিনি মহীশুরের গঙ্গা ও আলুপদের পরাস্ত করে গঙ্গা রাজকন্যার পানি গ্রহণ করেন। কোঙ্কনের মৌর্যদের আক্রমণ করে তিনি তাদের রাজধানী পুরী অধিকার করেন। উত্তরে মালব, লতা ও গুর্জররা তার অধীনতা স্বীকার করে। আইহোল লিপিতে হর্ষবর্ধনের সঙ্গে পুলকেশীর সংঘর্ষের কথা রয়েছে। গুজরাটের উপর অধিকারকে কেন্দ্র করে দু পক্ষের সংঘর্ষ বেঁধেছিল। হর্ষবর্ধনের ভয়ে পশ্চিম ভারতের বেশকিছু স্থানীয় শাসক পুলকেশীর পক্ষ নিয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। ৬১২/৬১৩ খ্রিস্টাব্দে নর্মদার তীরে একটি যুদ্ধে তিনি হর্ষবর্ধনকে পরাস্ত করে 'পরমেশ্বর' উপাধি গ্রহণ করেন। এই জয়লাভের পর মহারাষ্ট্রের উপর পুলকেশীর প্রাধান্য স্থাপিত হয়। মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক ও কোঙ্কন তাঁর অধিকার আসে। এর পর তিনি দক্ষিণ ভারতের পূর্বদিকে কোশল ও কলিঙ্গদের পরাস্ত করেন। গোদাবরী জেলার পৃষ্ঠপূরমে তিনি তাঁর দ্বিতীয় রাজধানী স্থাপন করেন এবং তাঁর ভ্রাতা কুঞ্জ বিষ্ণুবর্ধনকে গভর্নর নিযুক্ত করেন। এখান থেকেই চালুক্যদের বেঙ্গি শাখার আবির্ভাব হয়। 

দ্বিতীয় পুলকেশী আরও দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে পল্লব রাজা প্রথম মহেন্দ্রবর্মনকে আক্রমণ করেন। এইভাবে আগামী দু'শো বছর ব্যাপী পল্লব-চালুক্য দ্বন্দ্বের সূচনা হয়। প্রথম মহেন্দ্রবর্মন সম্ভবত দ্বিতীয় পুলকেশীর আক্রমণকে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। দ্বিতীয় পুলকেশী কাবেরী অতিক্রম করে চোল, কেরল ও পান্ড্যদের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করেন। পল্লবদের সঙ্গে শত্রুতা তার পক্ষে হিতকর হয়নি। সম্ভবত প্রথম নরসিংহবর্মনের হাতেই তিনি পরাজিত ও নিহত হয়েছিলেন (৬৪২)। প্রথম নরসিংহবর্মণ বাতাপি দখল করে বাতাপিকোন্ড উপাধি ধারন করেছিলেন।

কেবল সাম্রাজ্য বিস্তার নয় একজন দক্ষ ও প্রজাকল্যানকামী শাসক হিসাবেও তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর রাজ্য হিউয়েন সাং পরিভ্রমণ করেছিলেন এবং তাঁর শাসনপদ্ধতি, সামরিক শক্তি ও প্রজাহিতৈষনার প্রশংসা করেছেন। তাঁকে হিউয়েন সাং শিক্ষানুরাগী হিসাবেও চিহ্নিত করেছেন।

Chalukya King Pulakeshin II

Pulakeshin II was the greatest ruler of the Chalukya dynasty of southern India and a contemporary of Harshavardhana. His political history is well-documented in the Aihole inscription, composed by his court poet Ravikirti. The Chalukya dynasty of Badami (present-day Bijapur district in Karnataka) was founded by Pulakeshin I (535–566 CE), who also built the fortress of Badami. His successor, Maharaja Kirtivarman I (567–598 CE), expanded Chalukya's reign over a vast region of Deccan India. However, his successor, Mangalesha (598–611 CE), faced internal conflicts, leading to a civil war. Pulakeshin II emerged victorious and ascended the throne in 611 CE.

During the civil war, the Chalukya kingdom had weakened, and several subordinate rulers declared independence. Two rulers, Appayika and Govinda, even advanced toward the capital, crossing the Bhima River. Pulakeshin strategically allied with Govinda and defeated Appayika, restoring stability within the kingdom.

Once internal conflicts were resolved, Pulakeshin II launched a series of military campaigns. The Aihole inscription indicates that he conquered the Kadamba capital of Banavasi and integrated it into his empire. He also defeated the Gangas of Mysore and the Alupas and strengthened ties with them by marrying a Ganga princess. He then attacked the Mauryas of Konkan and captured their capital, Puri. In the north, Malwa, Lata, and Gurjara rulers accepted his suzerainty.

One of Pulakeshin II’s most significant military achievements was his conflict with Harshavardhana. Aihole inscriptions mention that the two rulers clashed over control of Gujarat. Several western Indian rulers sided with Pulakeshin, likely fearing Harsha’s expansion. In a battle fought on the banks of the Narmada River in 612/613 CE, Pulakeshin decisively defeated Harshavardhana and assumed the title Parameshvara (Supreme Lord). After this victory, he established dominance over Maharashtra, Karnataka, and Konkan. He later advanced eastward, defeating the Kosalas and Kalingas, and established his second capital at Pishtapura in the Godavari region, appointing his brother Vishnuvardhana as governor. This marked the beginning of the Eastern Chalukya branch at Vengi.

Pulakeshin II then turned his attention southward and launched an attack on the Pallava ruler Mahendravarman I, initiating a Chalukya-Pallava conflict that lasted for nearly two centuries. Mahendravarman I likely managed to resist Pulakeshin’s invasion. Pulakeshin, however, crossed the Kaveri River and formed alliances with the Cholas, Cheras, and Pandyas. Despite his successes, his hostility towards the Pallavas proved detrimental. Eventually, he was defeated and killed, possibly at the hands of Narasimhavarman I, the Pallava ruler who later captured Badami and assumed the title Vatapikonda (Conqueror of Vatapi).

Beyond military conquests, Pulakeshin II was an able and welfare-oriented ruler. His administration, military strength, and policies were highly praised by the Chinese traveler Xuanzang, who also described him as a patron of education and learning. Pulakeshin II’s reign marked the zenith of Chalukya power, and his legacy endured through both the Western Chalukyas of Badami and the Eastern Chalukyas of Vengi.

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আরবদের সিন্ধু অভিযান | কারণ ও তাৎপর্য

আরবদের সিন্ধু অভিযান | কারণ ও তাৎপর্য Please visit our Homepage and subscribe us. Suggested Topics || Ghajnavid Invasion || গজনী আক্রমণ || || মামুদের সোমনাথ মন্দির লুণ্ঠন || Somnath Temple Plunder || || তরাইনের যুদ্ধ ও তার গুরুত্ত্ব || মহম্মদ ঘুরির ভারত আক্রমন ও তার চরিত্র || সপ্তম শতকের প্রথমার্ধে আরবদেশে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। ইসলাম আরবদের নতুন করে জীবনীশক্তির সঞ্চার করে । ইসলাম ক্রমশ: একটি ধর্ম থেকে রাজনৈতিক শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় তারা আরবীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ভারতবর্ষের সঙ্গে আরবদের যোগাযোগ দীর্ঘদিনের। বাণিজ্যিক সূত্রে তারা নিয়মিত ভারতের উপকূল গুলিতে, বিশেষ করে মালাবার উপকূলে আসত। ভারতীয় ও চীনা পণ্য 'ধাও' নামক বিশেষ জাহাজে করে নিয়ে তারা ইউরোপের বাজারে বিক্রি করত। 712 খ্রিস্টাব্দে ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এর সেনাপতি ও জামাতা মোহাম্মদ বিন কাসেম সিন্ধু দেশে একটি সফল অভিযান করেন এবং সিন্ধুদেশ আরবীয় মুসলমানদের অধীনে চলে যায়। অভিযানের(প্রত্যক্ষ) কারণ ভারতবর্ষের প্রতি আরবদের দীর্ঘদিনের নজর ছিল। এর আ...

মহাফেজখানার শ্রেণীবিভাগ | Category of Archives

মহাফেজখানার শ্রেণীবিভাগ মহাফেজখানা বা লেখ্যাগারগুলি সাধারণ জনতার জন্য নয় মূলত গবেষক, ঐতিহাসিক, আইনবিদ, চিত্র পরিচালক প্রভৃতি পেশার লোকজন তাদের গবেষণার কাজে লেখ্যাগারে নথি পত্র দেখতে পারেন।  লেখ্যাগার পরিচালনা ও সংরক্ষিত নথির ভিত্তিতে লেখ্যাগগুলিকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়েছে।   1. সরকারি লেখ্যাগার:- কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার বা স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে যে লেখ্যাগারগুলি গড়ে ওঠে। সেগুলিকে সরকারি লেখ্যাগার বলা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এরকম সরকার পরিচালিত এক বা একাধিক লেখ্যাগার থাকে। যেমন, আমেরিকার Natonal Archive And records Administration (NARA)। ভারতবর্ষে র কেন্দ্রীয় লেখ্যাগার National Archive of India নামে পরিচিত। বিভিন্ন ঐতিহাসিক, প্রশাসনিক ও আইনগত নথি, মানচিত্র, নক্সা,  পাণ্ডুলিপি প্রভৃতি সংরক্ষিত থাকে। 2. বানিজ্যিক লেখ্যাগার:-  এটি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানের লেখ্যাগার বিভিন্ন বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান   মূলত তাদের সংস্থার ঐতিহাসিক এবং বানিজ্যিক নথি সংরক্ষিত রাখে। যেমন, ভারতের প্রথম বানিজ্যিক লেখ্যাগার হলো পুনার Tata Centrel Archive। 3. অলাভজনক লেখ্যাগ...

ষোড়শ শতকীয় ইউরোপে মূল্যবিপ্লব | Price Revolution

 ষোড়শ শতকের ইউরোপে মূল্য বিপ্লব   16 শতাব্দীতে ইউরোপীয় অর্থনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো মূল্য বিপ্লব। নিত্যব্যবহার্য পণ্যের মূল্য প্রায় 150 বছর সুস্থির থাকার পর ঊর্ধ্বমুখী হতে আরম্ভ করে, এবং 16 শতাব্দীর শেষে খাদ্যপণ্যের মূল্যের প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। পশ্চিম ইউরোপের অর্থনীতিতে এমন অভাবনীয় এবং সুদুরপ্রসারী ফলাফলসম্পন্ন ঘটনা মূল্য বিপ্লব নামে পরিচিত। মূল্য বিপ্লবের কতগুলি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যথা--    (১) কৃষিজ পণ্যের তুলনায় শিল্পজাত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি ছিল কম, এবং খাদ্যশস্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। (২) ভূমি রাজস্ব সহ ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক, তোলা ইত্যাদির হার বৃদ্ধি এবং ফটকাবাজির আবির্ভাব। (৩) মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় মজুরির হার খুবই কম ছিল বলে প্রকৃত আয় হ্রাস পেয়েছিল। (৪) ভূমি বিক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত হওয়া। (৫) গ্রামীণ বুর্জোয়াজি শ্রেণীর আবির্ভাব। ষোড়শ শতকের আগেও প্রাকৃতিক কারণে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল, তবে তা ছিল 2, 3 শতাংশের মতো, যা অস্বাভাবিক মনে হতো না। কিন্তু ষোল শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে যে নিরবিচ্ছিন্ন মূল্যবৃদ্ধি হ...