সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

প্রাচীন ভারতে কারিগর ও বণিক সংঘ | Artisan and Merchant Guilds in Ancient India

প্রাচীন ভারতে কারিগর ও বণিক সংঘ

প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য এবং ধর্ম শাস্ত্র গুলিতে বিভিন্ন বৃত্তিমূলক সংগঠনের উল্লেখ এসেছে। এগুলি শ্রেণী বা সংঘ নামে অভিহিত হয়েছে। প্রাচীন ভারতে পেশাদারী সংগঠনগুলির আবির্ভাব হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক নাগাদ। তবে এগুলির চরিত্র ও কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে বিশেষ তথ্য পাওয়া যায় না। মৌর্য যুগে এই সংগঠনগুলি খুব একটা উল্লেখ নেই। সম্ভবত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের চাপে শ্রেণীর বিকাশ কিছুটা ব্যাহত হয়েছিল। তবে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক নাগাদ অর্থনৈতিক ক্রিয়াকর্মের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ শিথিল হতে থাকায় শ্রেণীগুলির সক্রিয় উপস্থিতি এবং কার্যকলাপ লক্ষ করা যায়। 

জাতকের কাহিনী গুলিতে এবং সমকালীন লেখমালায় কারিগরি সংগঠনের একাধিক উল্লেখ রয়েছে। জাতকের গল্পে এমন একটি গ্রামের উল্লেখ রয়েছে যেখানে ১০০০ কর্মকার বাস করে। একটি বদ্ধকিদের গ্রামের কথাও আছে। শ্রাবস্তির মতো শহরের একটি রাস্তায় পদ্ম ফুলের মালাকারদের বসবাসের কথা রয়েছে। শ্রেণীর আওতায় আসার ফলে এক একটি কারিগরি উৎপাদন আঞ্চলিক রূপ নিচ্ছিল। ধর্মশাস্ত্র মতে একটি অঞ্চলে কোনো একটি কারিগরি উৎপাদনের একটি সংগঠন থাকার কথা। তবে এর ব্যতিক্রম ছিল। যেমন নহপানের একটি লেখ থেকে জানা যায় নাসিকে তাঁতীদের দুটি সক্রিয় সংগঠন ছিল।

জাতকের গল্পে শ্রেণীর প্রধানকে 'জ্যেষ্ঠক' বা 'প্রমুখ' বলা হয়েছে। তিনি পরিচালন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। তবে কারিগরি দক্ষতার ভিত্তিতে নাকি বয়সের বিচারে তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত হতেন তা জানা যায় না। মনু ও যজ্ঞবল্ক 'কার্যচিন্তক' নামে পদাধিকারী উল্লেখ করেছেন। 'কার্যচিন্তক'কে সৎ বংশজাত, কর্ম কুশল, বিশ্বস্ত ও ন্যায়পরায়ন হতে হত। প্রমুখ বা জ্যেষ্ঠকের সহকারী হিসেবে এই নতুন পদের আবির্ভাব হয়েছিল। সুতরাং বোঝাই যায় শ্রেণীর কাজের পরিমাণ ও পরিধি ক্রমশ বাড়ছিল।

শ্রেণীর সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট আচরণবিধি ও নিয়মাবলীর উল্লেখ পাওয়া যায়। শাস্ত্রে সংঘের সামূহিক চরিত্রের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংঘের কারিগরদের আয় সমানভাবে বন্টিত হত। কোনো কারিগর কোনো নতুন কৌশল আবিষ্কার করার ফলে কারবারে অধিক উপার্জন হলে ওই সদস্যের তাতে কোনো বিশেষ অধিকার থাকত না। অন্যদিকে কোনো সদস্য যদি সংঘের স্বার্থের বিরুদ্ধে বা চুক্তিবিরোধী কো্নো কাজ করে এবং এর জন্য যদি সংঘের আর্থিক ক্ষতি হয় তাহলে সেই ক্ষতিপূরণের দায় ওই দোষী সদস্যের উপর বর্তাত। সংঘের আইন না মানলে অপরাধী সদস্যকে নির্বাসিত করা যেত বা তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা যেত। 

ধর্মশাস্ত্রে শ্রেণীর ধর্মকে দেশ ও রাজার আইনের সমান মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এর থেকেই বোঝা যায় শ্রেণীর ভিতরের ব্যাপারে রাজা বা তার প্রশাসনের হস্তক্ষেপকে ধর্মশাস্ত্রাকাররা মেনে নেয়নি। শ্রেণীর পদক্ষেপকে রাজা অনুমোদন করবেন এরকমই ধরে নেওয়া হতো। 

কারিগরি বৃত্তি গুলিকে সুগঠিত করা ছাড়াও শ্রেণীগুলির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল। লেখমালার তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, শ্রেণীগুলি সেযুগে আধুনিক ব্যাংকের ভূমিকা পালন করত। নহপানের জামাতা ঋষভ দত্ত নাসিকের দুটি তাঁতি সংগঠনে যথাক্রমে ২০০০ এবং ১০০০ কার্ষাপণ পরিমাণ অর্থ জমা রাখেন। প্রথমটির সুদ ছিল বার্ষিক ১২ শতাংশ হারে এবং দ্বিতীয়টির সুদ ছিল বার্ষিক ৯ শতাংশ হারে। এই দুই সুদের অর্থ নিকটস্থ বৌদ্ধ সংঘের ভিক্ষুদের খাওয়া-দাওয়া বাবদ খরচের জন্য চলে যেত। রাজা হুবিস্কের সময়ে মথুরায় ময়দা তৈরীর কারিগরদের শ্রেণীতে এক উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী ৫০ পুরাণ আমানত গচ্ছিত রাখেন। এর সুদ দিয়ে একটি মন্দিরে প্রতিদিনের ছাতু, সবজি ও লবনের যোগান হত। শ্রেণিগুলি কখনো নগদ অর্থ ছাড়াও স্থাবর সম্পত্তি যেমন জমি, গাছ প্রভৃতি স্থায়ী আমানত হিসেবে রাখত। তবে শ্রেণীর যাবতীয় আমানত ছিল স্থায়ী ও চিরকালীন। 

সমকালীন সমাজ জীবনে শ্রেণীগুলির গুরুত্ব ও জনপ্রিয়তা সম্পর্কে কোন সন্দেহ নেই। কারণ রাজা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সকলেই শ্রেণিগুলিতে আমানত গচ্ছিত রাখতে পারত। দ্বিতীয়তঃ আমানত গুলি যেহেতু চিরকালীন তাই শ্রেণীর বিশ্বস্ততা নিয়ে কোন সংশয় ছিল না। অন্য দিক থেকে বিচার করলে বলা যায়, চিরকালীন ভিত্তিতে আমানত পাওয়ার ফলে কারিগরি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনের ব্যবস্থা হয়ে যেত।  তৃতীয়তঃ ধর্ম তথা সাংস্কৃতিক ক্রিয়া-কলাপে সংঘের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। 

সুতরাং ঐক্যবদ্ধ সংগঠন, কারিগরদের মধ্যে সহযোগিতার মনোভাব বৃদ্ধি, অহেতুক রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ পরিহার করা, পর্যাপ্ত মূলধনের ব্যবস্থা প্রভৃতি--  কারিগরি বৃত্তির প্রসারের যা যা প্রধান শর্ত-- সেগুলিকে শ্রেনি নিশ্চিত করতে পেরেছিল বলে আলোচ্য পর্বে কারিগরি উৎপাদনের সংখ্যা বৈচিত্র নজিরবিহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল।

Artisan and Merchant Guilds in Ancient India

Ancient Indian literature and religious scriptures mention various professional organizations, which were referred to as Shreni or Sangha. The emergence of professional organizations in ancient India can be traced back to around the 6th century BCE. However, detailed information regarding their structure and functioning is scarce. During the Maurya period, there are limited references to these organizations, possibly due to strict state control, which might have hindered the growth of the Shrenis. However, by the 2nd century BCE, as state control over economic activities gradually loosened, these guilds became more active and visible.

The Jataka tales and contemporary inscriptions contain multiple references to artisan guilds. One Jataka story mentions a village where 1,000 blacksmiths resided, and another mentions a village of bamboo craftsmen. In cities like Shravasti, there was an entire street inhabited by lotus garland makers. Due to the guild system, specific regions became known for specialized crafts. According to religious texts, an area was expected to have only one guild for a particular craft. However, exceptions existed. For example, an inscription from Nahapana's reign reveals that in Nasik, there were two active weaver guilds.

In Jataka tales, the head of a Shreni is referred to as "Jyeshthaka" or "Pramukha", who was responsible for the administration of the guild. However, it remains unclear whether this position was attained based on technical expertise or seniority in age. Legal texts like Manusmriti and Yajnavalkya Smriti mention a guild officer called "Karyachintaka". This official was required to be of noble descent, skilled in work, trustworthy, and just. The position of Karyachintaka seems to have emerged to assist the guild leader, indicating that the responsibilities and scope of the Shrenis were expanding over time.

Guilds followed specific codes of conduct and regulations for their members. Religious scriptures emphasize the collective character of guilds. The earnings of artisans within a guild were distributed equally among its members. If a craftsman developed a new technique that led to increased profits, he had no exclusive right over the additional earnings. Conversely, if a member acted against the interests of the guild or violated an agreement, causing financial losses to the guild, he was held accountable for compensation. Non-compliance with guild laws could result in expulsion or confiscation of property.

Religious texts equated guild laws with the laws of the state and the king. This suggests that ancient legal theorists did not favor state interference in the internal matters of Shrenis. It was assumed that the king would approve the guilds’ decisions without intervention.

Apart from organizing craft production, Shrenis also played a crucial role in financial activities. Inscriptions suggest that these guilds functioned similarly to modern banks. For example, Nahapana’s son-in-law, Rishabhadatta, deposited 2,000 and 1,000 Karshapanas in two separate weaver guilds in Nasik. The first deposit earned 12% annual interest, while the second yielded 9% annual interest. The interest was utilized for feeding Buddhist monks in a nearby monastery. Similarly, during the reign of King Huvishka, an official in Mathura deposited 50 Puranas in a flour makers’ guild, with the interest funding the daily supply of roasted grain, vegetables, and salt for a temple. Shrenis also accepted non-monetary deposits such as land, trees, and other immovable assets. However, all guild deposits were considered permanent and perpetual.

There is no doubt about the importance and popularity of guilds in contemporary society. From royalty to common people, everyone could deposit their wealth in these organizations. The perpetual nature of deposits ensured unwavering trust in guilds. Moreover, since guilds could secure long-term capital, they facilitated the expansion of craft production. Lastly, Shrenis played a significant role in religious and cultural activities.

Thus, by ensuring cohesive organization, fostering cooperation among artisans, minimizing unnecessary state intervention, and securing sufficient capital, the Shrenis successfully met the essential conditions for the expansion of craft production. As a result, during this period, there was an unprecedented diversification in artisanal production.

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আরবদের সিন্ধু অভিযান | কারণ ও তাৎপর্য

আরবদের সিন্ধু অভিযান | কারণ ও তাৎপর্য Please visit our Homepage and subscribe us. Suggested Topics || Ghajnavid Invasion || গজনী আক্রমণ || || মামুদের সোমনাথ মন্দির লুণ্ঠন || Somnath Temple Plunder || || তরাইনের যুদ্ধ ও তার গুরুত্ত্ব || মহম্মদ ঘুরির ভারত আক্রমন ও তার চরিত্র || সপ্তম শতকের প্রথমার্ধে আরবদেশে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। ইসলাম আরবদের নতুন করে জীবনীশক্তির সঞ্চার করে । ইসলাম ক্রমশ: একটি ধর্ম থেকে রাজনৈতিক শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় তারা আরবীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ভারতবর্ষের সঙ্গে আরবদের যোগাযোগ দীর্ঘদিনের। বাণিজ্যিক সূত্রে তারা নিয়মিত ভারতের উপকূল গুলিতে, বিশেষ করে মালাবার উপকূলে আসত। ভারতীয় ও চীনা পণ্য 'ধাও' নামক বিশেষ জাহাজে করে নিয়ে তারা ইউরোপের বাজারে বিক্রি করত। 712 খ্রিস্টাব্দে ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এর সেনাপতি ও জামাতা মোহাম্মদ বিন কাসেম সিন্ধু দেশে একটি সফল অভিযান করেন এবং সিন্ধুদেশ আরবীয় মুসলমানদের অধীনে চলে যায়। অভিযানের(প্রত্যক্ষ) কারণ ভারতবর্ষের প্রতি আরবদের দীর্ঘদিনের নজর ছিল। এর আ...

মহাফেজখানার শ্রেণীবিভাগ | Category of Archives

মহাফেজখানার শ্রেণীবিভাগ মহাফেজখানা বা লেখ্যাগারগুলি সাধারণ জনতার জন্য নয় মূলত গবেষক, ঐতিহাসিক, আইনবিদ, চিত্র পরিচালক প্রভৃতি পেশার লোকজন তাদের গবেষণার কাজে লেখ্যাগারে নথি পত্র দেখতে পারেন।  লেখ্যাগার পরিচালনা ও সংরক্ষিত নথির ভিত্তিতে লেখ্যাগগুলিকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়েছে।   1. সরকারি লেখ্যাগার:- কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার বা স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে যে লেখ্যাগারগুলি গড়ে ওঠে। সেগুলিকে সরকারি লেখ্যাগার বলা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এরকম সরকার পরিচালিত এক বা একাধিক লেখ্যাগার থাকে। যেমন, আমেরিকার Natonal Archive And records Administration (NARA)। ভারতবর্ষে র কেন্দ্রীয় লেখ্যাগার National Archive of India নামে পরিচিত। বিভিন্ন ঐতিহাসিক, প্রশাসনিক ও আইনগত নথি, মানচিত্র, নক্সা,  পাণ্ডুলিপি প্রভৃতি সংরক্ষিত থাকে। 2. বানিজ্যিক লেখ্যাগার:-  এটি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানের লেখ্যাগার বিভিন্ন বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান   মূলত তাদের সংস্থার ঐতিহাসিক এবং বানিজ্যিক নথি সংরক্ষিত রাখে। যেমন, ভারতের প্রথম বানিজ্যিক লেখ্যাগার হলো পুনার Tata Centrel Archive। 3. অলাভজনক লেখ্যাগ...

ষোড়শ শতকীয় ইউরোপে মূল্যবিপ্লব | Price Revolution

 ষোড়শ শতকের ইউরোপে মূল্য বিপ্লব   16 শতাব্দীতে ইউরোপীয় অর্থনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো মূল্য বিপ্লব। নিত্যব্যবহার্য পণ্যের মূল্য প্রায় 150 বছর সুস্থির থাকার পর ঊর্ধ্বমুখী হতে আরম্ভ করে, এবং 16 শতাব্দীর শেষে খাদ্যপণ্যের মূল্যের প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। পশ্চিম ইউরোপের অর্থনীতিতে এমন অভাবনীয় এবং সুদুরপ্রসারী ফলাফলসম্পন্ন ঘটনা মূল্য বিপ্লব নামে পরিচিত। মূল্য বিপ্লবের কতগুলি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যথা--    (১) কৃষিজ পণ্যের তুলনায় শিল্পজাত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি ছিল কম, এবং খাদ্যশস্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। (২) ভূমি রাজস্ব সহ ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক, তোলা ইত্যাদির হার বৃদ্ধি এবং ফটকাবাজির আবির্ভাব। (৩) মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় মজুরির হার খুবই কম ছিল বলে প্রকৃত আয় হ্রাস পেয়েছিল। (৪) ভূমি বিক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত হওয়া। (৫) গ্রামীণ বুর্জোয়াজি শ্রেণীর আবির্ভাব। ষোড়শ শতকের আগেও প্রাকৃতিক কারণে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল, তবে তা ছিল 2, 3 শতাংশের মতো, যা অস্বাভাবিক মনে হতো না। কিন্তু ষোল শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে যে নিরবিচ্ছিন্ন মূল্যবৃদ্ধি হ...