খলিফার সময়ে ইসলামের সাথে ইহুদি ও খ্রিস্টানের সম্পর্ক | The Relationship between Jews and Christians with Islam during the Caliphate
খলিফার সময়ে ইসলামের সাথে ইহুদি ও খ্রিস্টানের সম্পর্ক
হজরত মুহাম্মদের (৬৩২ খ্রিস্টাব্দে) মৃত্যুর পর তার আরব সাম্রাজ্যের শাসনভার এসে পড়ে খলিফার হাতে। প্রথম খলিফার নাম ছিল হজরত আবু বকর। খ্রিষ্টান ও ইহুদিরা ইসলামিক রাষ্ট্রে জিম্মি হিসাবে পরিচিত। তবে মহম্মদের শাসনে জিম্মিদের ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকার রক্ষা, তাঁদের জীবন-সম্পত্তির যথাযথ নিরাপত্তা বিধান করা এবং তাঁদের বিরুদ্ধে অন্যায় হলে অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে শাস্তিবিধানের নিয়ম চালু হয়েছিল। এর ফলে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের সঙ্গে প্রথম দিকে ইসলামের কোন সংঘাত ছিল না। মদিনার ইহুদীদের অনেকেই মুহম্মদের সাথে প্রতারণামূলক আচরন করেছিলেন মক্কার কোরায়েশদের সাথে যোগদান করে মহম্মদ ও ইসলাম বিরোধী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। তাই মদিনার ইহুদীদের সাথে মহম্মদের জীবাদ্দশায়ই ইসলামের বিরোধ শুরু হয়েছিল এবং খলিফাদের শাসনে তা অব্যহত ছিল। কিন্তু মহম্মদের সাথে খ্রিষ্টানদের অত্যন্ত সুসম্পর্ক বজায় ছিল। কিন্তু খলিফাদের রাজত্বকালে খ্রিস্টানদের সঙ্গে বিভিন্ন কারণে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। খলিফাদের নেতৃত্বে ইসলামিক সাম্রাজ্যের যে সম্প্রসারণের সূচনা হয়েছিল তার ফলে খ্রিস্টানদের সঙ্গে মুসলমানদের একাধিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু এই যুদ্ধগুলি ধর্মীয় কারণে সংঘটিত যুদ্ধ ছিল না, এগুলি ছিল রাজনৈতিক যুদ্ধ।
রোমানদের সঙ্গে আরবিয়ানদের লাগাতার যুদ্ধ চলেছিল। আরবের ইসলামীয় সাম্রাজ্য খলিফাদের আমলে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছিল। মহম্মদ যেখানে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন, খলিফারা সেখানে আরবের অনুর্বর ভূখণ্ডের বাইরে পারস্য, সিরিয়া, মিশর প্রভৃতি উর্বর দেশ গুলিতে আরব সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটাতে চেয়েছিলেন। এই সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করেই বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ে। প্রথম খলিফা আবু বকরের আমলে মুসলিম বাহিনী রোমান সম্রাটের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় লাভ করেছিল।
জিম্মি হওয়ার জন্য ইসলামিক রাষ্ট্রে ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হত। এমনিতে জিম্মিগন দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক হিসাবে গন্য হতেন। তাদের নিজেদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে জিজিয়া কর প্রদান করতে হত। তুলনামুলক ভাবে খরাজ বা অন্যান্য করের হার জিম্মিদের উপর একটু বেশি থাকত। তাদের উচ্চহারে বাণিজ্যশুল্ক এবং ভ্রমণ কর দিতে হত। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসকগন তাদের কাছ থেকে আরও এক প্রকার নিরাপত্তা কর অ্যানিভিয়া আদায় করতেন। দ্বিতীয়ত, মুসলমানরা যত সহজে রাষ্ট্রীয় উচ্চপদ লাভ করতে পারত, জিম্মিদের ক্ষেত্রে তা ততটা সহজ ছিল না। তাদের কাছে প্রশাসনিক উচ্চ পদ ছিল এক প্রকার ব্যতিক্রমী প্রাপ্তি। তৃতীয়ত, আইনি সুবিধার দিক থেকেও তারা বঞ্চনার শিকার হত। কোনো মুসলমান সাক্ষী ছাড়া তারা কোনো মুসলমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারত না। এই ব্যবস্থার সুবিধা নিয়ে মুসলিম প্রভূরা তাদের উপর অত্যাচার করত। চতুর্থত, পোষাক পরিচ্ছদ এবং বাসস্থান মুসলমানদের থেকে জিম্মিদের ভিন্নতর হতে হত। জিম্মিদের জন্য পোষাকের যে পৃথক ধরন ছিল তা অবশ্য বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন ছিল। মুসলমান এলাকাগুলিতে তাদের বসবাসের অনুমতি ছিল না, অনেকক্ষেত্রে বেশ কিছু রাস্তা ব্যবহারের অনুমতি তারা পেত না। পঞ্চমত, ধর্মীয় ক্ষেত্রেও তারা বৈষম্যের শিকার হত। গির্জা ও সিনাগগ গুলি নির্মাণ ও সংস্কারের অনুমতি পেত না। অনেক ক্ষেত্রে গির্জায় ঘন্টা বাজানোর অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তাদের কবরস্থান গুলিও সেভাবে সংস্কার করা হত না। তবে এই বৈষম্য সার্বিক ছিল না। আবার খ্রিষ্টান রাষ্ট্রগুলিও এই বৈষম্য দোষ থেকে মুক্ত ছিল না। মধ্যযুগের ধর্মীয় শাসনে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর প্রতি এই ধরনের বৈষম্য একটা স্বাভাবিক চিত্র ছিল।
খলিফারা অমুসলমানদের প্রতি একেবারে অনুদার ছিলেন এমন নয়। অমুসলমান ইহুদী ও খ্রিস্টানদের জিজিয়া কর প্রদান করতে হতো। এর পরিবর্তে তারা সাম্রাজ্যে নিরাপদে থাকার প্রতিশ্রুতি পেত। তাদের জন্য সামরিক দায়-দায়িত্ব পালন বাধ্যতামূলক ছিল না। দ্বিতীয় খলিফা উমর ফারুক সরকারি কোষাগার থেকে দরিদ্র ও অসহায় জিম্মিদের জন্য নিয়মিতভাবে ভাতা ও সাহায্য দানের ব্যবস্থা করতেন। তিনি খ্রিস্টান গির্জা ও ইহুদীদের সিনাগগ গুলিকে নিয়মিতভাবে সংস্কার করতেন। ফিলিপ হিত্তি লিখেছেন যে তারা চাইলে নিজ নিজ ধর্মীয় বিধানের ভিত্তিতে তাদের ধর্মীয় প্রধানকে দিয়ে বিচারের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে নিষ্পত্তি করতে পারতো। জেরুজালেম দখলের পর উমর যখন জেরুজালেমের গির্জা পরিদর্শনে যান তখন তিনি গির্জার ভিতরে নামাজ পড়েননি, বাইরে পড়েছিলেন। এর কারন হিসাবে তিনি বলেছিলেন, তিনি যদি ভিতরে নামাজ পড়তেন তাহলে তার উৎসাহী অনুগামীরা এমন দাবি করতে পারত যে, যেহেতু খলিফা এখানে নামাজ পড়েছেন সুতরাং এই স্থান এখন তাদের। এ প্রসঙ্গে মাইকেল পেনের মন্তব্য প্রনিধানযোগ্য। তিনি বলছেন যে আরবরা খ্রিষ্ট ধর্মের বিরধিতা করেন নি, বরং তারা এই ধর্ম, ধর্মীয় স্থান এবং যাজকদের সম্মান প্রদর্শন করেছেন।
মহম্মদের একনিষ্ট ভক্ত এবং ধর্মীয় শাসক হিসাবে পরিচিত মোয়াবিয়া বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর সময় শাসক ও শাসিত পাশাপাশি বাস করত। তিনি ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত এডেসার গির্জা পুনর্নির্মাণের ব্যবস্থা করেছিলেন। বহু খ্রিস্টান ও ইহুদি পণ্ডিত তাঁর দরবার অলংকৃত করতেন। খলিফা দ্বিতীয় উমর যেসব গির্জা ও সিনাগগ মসজিদে রূপান্তরিত হয়েছিল সেগুলি খ্রিস্টান ও ইহুদের প্রত্যার্পণ করেছিলেন। আব্বাসীয় খলিফা মামুন সকল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি রাষ্ট্র পরিষদ গড়ে তুলেছিলেন। এর প্রতিনিধিদের কাজই ছিল সরকারকে শাসনকারযে সহযোগিতা করা।
উমাইয়া এবং আব্বাসীয় যুগে সুষ্ঠু প্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের প্রশানিক পদে নিয়োগ করা শুরু হয়। ইরাকে ফার্সি এবং মিশরে গ্রিক ভাষা সরকারি ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি পায়। এর পর খ্রিষ্টান ভাষাবিদদের নিয়োগ শুরু হয়। খলিফা আব্দুল মালিকের সময় থেকে প্রশাসনে অমুসলমানদের সংখ্যা দ্রুত হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে। দামাস্কাশে সেন্ট জন ও তাঁর পিতা উমাইয়া প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। খলিফা ইয়াজিদের ভালো বন্ধু ছিলেন খ্রিষ্টান কবি আখতাল। কায়রোর দরবারের বিখ্যাত চিকিৎসক ও দার্শনিক ছিলেন ইহুদি ইবন-মায়মুন। কায়রোর ফতেমিদ খলিফা আল-হাকাম ছাড়া সব খলিফাই ইহুদি ও খ্রিস্টানদের প্রতি উদারতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তাদের অনেকেই ওয়াজির বা প্রধানমন্ত্রীর পদ লাভ করেছিলেন (ইবন কিলিজ এবং হাসান ইব্রাহিম)। ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে যখন স্পেনে মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠা হয় তখন ইহুদিরা মুসলমানদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। স্থানীয় ভিসিগথ এবং ইহুদিরা মুসলমান শাসনে অসামান্য স্বাধীনতা ভোগ করতেন।
সুতরাং খলিফা যুগে ইসলামিক রাষ্ট্রে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের সাথে একদিকে যেমন শোষণ ও বঞ্চনার চিত্র ধরা পড়ে তেমন আরেকদিকে অজস্র সুসম্পর্কের দৃষ্টান্ত দেখা যায়। সুতরাং বিষয়টি সম্পর্কে কখনই একপেশে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
The Relationship between Jews and Christians with Islam during the Caliphate
After the death of Prophet Muhammad (in 632 CE), the governance of his Arab empire fell into the hands of the Caliphs. The first Caliph was Hazrat Abu Bakr. Christians and Jews were known as dhimmis (protected people) in the Islamic state. However, under Muhammad's rule, the rights of dhimmis to practice their religion and maintain their social customs were protected. Their lives and properties were safeguarded, and rules were established to punish those who wronged them. As a result, there was initially no conflict between Islam and Jews or Christians. However, some Jews in Medina had betrayed Muhammad by allying with the Quraysh of Mecca and participating in wars against him and Islam. Thus, conflicts between Islam and the Jews of Medina began during Muhammad's lifetime and continued during the Caliphate. On the other hand, Muhammad maintained excellent relations with Christians. However, during the Caliphate, conflicts with Christians arose for various reasons. The expansion of the Islamic empire under the Caliphs led to multiple wars between Muslims and Christians. These wars, however, were not religious but political in nature.
The Arabs were engaged in continuous wars with the Romans. The Islamic empire of Arabia became aggressive during the Caliphate. While Muhammad had limited himself to defensive wars, the Caliphs sought to expand the Arab empire beyond the barren lands of Arabia into fertile regions like Persia, Syria, and Egypt. This expansion inevitably led to conflicts with the Byzantine Empire. During the reign of the first Caliph, Abu Bakr, the Muslim forces achieved a decisive victory against the Roman Emperor.
Dhimmis (Jews and Christians) faced various challenges in the Islamic state. They were considered second-class citizens. To ensure their safety, they had to pay the jizya tax. Comparatively, the tax burden on dhimmis was higher, including higher trade tariffs and travel taxes. Local administrators also collected an additional security tax called aniviya from them. Secondly, while Muslims could easily attain high-ranking positions in the state, it was much harder for dhimmis. Administrative high posts were rare exceptions for them. Thirdly, they were disadvantaged legally. They could not file complaints against Muslims without Muslim witnesses. This system was often exploited by Muslim masters to oppress them. Fourthly, their clothing and residences had to be distinct from those of Muslims. The specific dress codes for dhimmis varied across regions. They were often barred from living in Muslim areas and using certain roads. Fifthly, they faced religious discrimination. They were not allowed to build or renovate churches or synagogues. In many cases, they were even denied the right to ring church bells. Their cemeteries were also neglected. However, this discrimination was not universal, and Christian states were not free from similar biases. Such discrimination against people of different faiths was a common feature of medieval religious governance.
The Caliphs were not entirely unsympathetic towards non-Muslims. Jews and Christians, as dhimmis, had to pay the jizya tax, but in return, they were promised safety within the empire. They were not obligated to perform military duties. The second Caliph, Umar Farooq, regularly provided allowances and aid to poor and helpless dhimmis from the state treasury. He also ensured the regular maintenance of Christian churches and Jewish synagogues. Philip Hitti noted that dhimmis could resolve disputes based on their own religious laws through their religious leaders. When Umar visited the Church of the Holy Sepulchre in Jerusalem after its conquest, he chose to pray outside the church rather than inside. He explained that if he prayed inside, his enthusiastic followers might claim the site as a Muslim place of worship. Michael Penn remarks that the Arabs did not oppose Christianity but rather respected the religion, its places of worship, and its clergy.
Muawiya, known as a devout follower of Muhammad and a religious ruler, demonstrated a pragmatic approach. During his reign, rulers and subjects coexisted peacefully. He arranged for the reconstruction of the Church of Edessa after it was destroyed by an earthquake. Many Christian and Jewish scholars adorned his court. Caliph Umar II returned churches and synagogues that had been converted into mosques to Christians and Jews. Abbasid Caliph Mamun established a state council with representatives from all religious institutions to assist in governance.
During the Umayyad and Abbasid eras, Jews and Christians began to be appointed to administrative positions to establish efficient governance. Persian was recognized as the official language in Iraq, and Greek in Egypt. Christian linguists were subsequently employed. From the time of Caliph Abdul Malik, the number of non-Muslims in administration increased rapidly. In Damascus, Saint John and his father played significant roles in the Umayyad administration. The Christian poet Akhtal was a close friend of Caliph Yazid. The famous physician and philosopher in Cairo's court was the Jewish scholar Ibn Maimun. Except for Fatimid Caliph Al-Hakam in Cairo, all Caliphs showed tolerance towards Jews and Christians. Many of them even held positions like wazir (prime minister), such as Ibn Killis and Hasan Ibrahim. When Muslim rule was established in Spain in 711 CE, Jews extended their support to the Muslims. Both local Visigoths and Jews enjoyed remarkable freedom under Muslim rule.
Thus, during the Caliphate, the relationship between Jews, Christians, and the Islamic state was complex. On one hand, there were instances of exploitation and discrimination, but on the other, there were numerous examples of harmonious coexistence. Therefore, it is impossible to draw a one-sided conclusion about this relationship.
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন