সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কনিষ্কের সাংস্কৃতিক অবদান | Cultural Contributions of Kanishka

কনিষ্কের সাংস্কৃতিক অবদান

কুষাণদের রাজত্বকাল কেবল রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে নয়, এই পর্ব বহুমুখী সাংস্কৃতিক সৃজনশীলতার জন্যও প্রসিদ্ধ। কুষান রাজত্বকালে সবথকে অধিক সাংস্কৃতিক কার্যকলাপ লক্ষ করা যায় কণিষ্কের রাজত্ব কালে। পন্ডিত অশ্বঘোষের প্রভাবে কনিষ্ক বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন বলে জানা যায়। তিনি বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। এর পাশাপাশি তিনি ধর্মীয় সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করেন এবং সাহিত্য, স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। 

বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অনুরাগ থেকে তিনি তাঁর সাম্রাজ্যে বহু বৌদ্ধমঠ, বিহার ও স্তুপ স্থাপন করেন। কনিষ্ক তার রাজধানী পুরুষপুরে গৌতম বুদ্ধের দেহবাশেষ এর উপর একটি বহু তল চৈত্য নির্মাণ করেন। গ্রিক স্থপতি অ্যাজেসিলাস এই চৈত্যের নকশা তৈরি করেন। তিনি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের প্রচুর দান করতেন। ডক্টর হেমচন্দ্র রায়চৌধুরীর মতে বিজেতা হিসেবে কৃতিত্ব অপেক্ষা শাক্য মুনির ধর্মের পৃষ্ঠপোষক হিসাবে কনিষ্কের অধিক কৃতিত্ব লক্ষ্য করা যায়। 

বৌদ্ধ ধর্মের প্রসারের জন্য তিনি কাশ্যপ মাতঙ্গ এবং ধর্মরত্নকে চিনে পাঠিয়েছিলেন। তারই প্রচেষ্টায় মহাজন ধর্মমত ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে চীন, তিব্বত, জাপান, কোরিয়া এবং মধ্যে এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে প্রসার লাভ করেছিল। বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা এবং এই ধর্মের প্রচারের জন্য ডক্টর ভিন্সেন্ট স্মিথ কনিষ্ককে 'দ্বিতীয় অশোক' বলে অভিহিত করেছেন। 

কনিষ্ক তার রাজত্বকালে রাজধানী পেশোয়ার মতান্তরে জলন্ধরে চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতের আহ্বান করেন। তিন মাস ধরে এই অধিবেশন চলে এবং এখানে ত্রিপিটকের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য বসু মিত্রের মহাবিভাষা গ্রন্থে সংকলিত হয়। এই অধিবেশনে বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে মতপার্থক্য দূর হয় এবং সংহতি স্থাপিত হয়। এভাবে বৌদ্ধ ধর্মে  মহাযান সম্প্রদায়ের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। মহাযান পন্থা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি লাভ করে এবং গৌতম বুদ্ধের মূর্তিপূজা শুরু হয়।

নিজে বৌদ্ধ ধর্মের অনুরাগী হওয়ার সত্ত্বেও সম্রাট কনিষ্ক অন্য ধর্মের প্রতিও যথেষ্ট সহানুভূতিশীল ছিলেন। তিনি পারসিক, গ্রীক ও হিন্দু দেবদেবীর প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং বিভিন্ন পাহাড়ের গায়ে দেবদেবীর মূর্তি খোদাই করিয়েছিলেন। তার মুদ্রায় হিন্দু গ্রীক ও পারসিক দেবদেবীর ছবি উৎকীর্ণ হয়েছিল। 

শুধুমাত্র ধর্মীয় ক্ষেত্রে নয় সাহিত্য, স্থাপত্য, ভাস্কর্য এবং চিত্রকলার ক্ষেত্রেও কনিষ্কের শাসনকাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। তিনি সাহিত্যের অনুরাগী পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তার রাজসভায় অশ্বঘোষ নাগার্জুন, বসুমিত্র, চরক, প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। কনিষ্কের আমলে সংস্কৃত ভাষা তার হারানো গৌরব ফিরে পায়। সাহিত্য, নাটক, দর্শন, সংগীত প্রভৃতি বিষয়ে বিভিন্ন বিখ্যাত গ্রন্থ এই যুগে রচিত হয়।

স্থাপত্যের ক্ষেত্রে তার অবদান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ তিনি গ্রিক স্থপতি অ্যাজেসিলাসকে দিয়ে তারা সভা অলংকৃত করিয়েছিলেন। তিনি রাজধানী পেশোয়ারকে সুসজ্জিত করেন এবং কাশ্মীরে কনিষ্কপুর নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। তার সময় গান্ধার, মথুরা, অমরাবতী এবং সারনাথ এই চার ধরনের শিল্পরীতির বিকাশ ঘটে। গ্রিক, রোমান ও ভারতীয় শিল্পরীতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা গান্ধার শিল্প ছিল এগুলির মধ্যে সবচেয়ে উতকৃষ্ট। গান্ধার শিল্পের বিশেষত্ব ছিল এই যে, রমেশচন্দ্র মজুমদারে ভাষায়, গান্ধার শিল্পীদের হাত দুটি গ্রিক দেশের হলেও অন্তর ছিল সম্পূর্ণরূপে ভারতীয়।

Cultural Contributions of Kanishka

The reign of the Kushans is renowned not only for its political and economic achievements but also for its multifaceted cultural creativity. Among the Kushan rulers, Kanishka's reign stands out as the most culturally vibrant. Influenced by the scholar Ashvaghosha, Kanishka is said to have embraced Buddhism. He became a patron of Buddhism while also adopting a policy of religious tolerance. His contributions to literature, architecture, and sculpture were significant.

Driven by his devotion to Buddhism, Kanishka established numerous Buddhist monasteries, viharas, and stupas across his empire. In his capital, Purushapura (modern-day Peshawar), he constructed a multi-storied chaitya (shrine) over the relics of Gautama Buddha. The design of this chaitya was created by the Greek architect Agesilaus. Kanishka generously donated to Buddhist monks. According to Dr. Hemchandra Raychaudhuri, Kanishka's legacy as a patron of the Buddha's teachings surpasses his achievements as a conqueror.

To spread Buddhism, Kanishka sent Kashyapa Matanga and Dharmaratna to China. His efforts led to the expansion of Mahayana Buddhism beyond India, reaching China, Tibet, Japan, Korea, and various parts of Central Asia. For his patronage and promotion of Buddhism, Dr. Vincent Smith referred to Kanishka as the "Second Ashoka."

During his reign, Kanishka convened the Fourth Buddhist Council in his capital, Peshawar (or alternatively, Jalandhar). This council lasted for three months, during which various interpretations of the Tripitaka were compiled in Vasumitra's *Mahavibhasha*. The council resolved differences among Buddhist sects and fostered unity. This marked the rise of the Mahayana school, which gained state recognition. The practice of idol worship of Gautama Buddha also began during this period.

Despite being a devout Buddhist, Kanishka showed considerable respect for other religions. He honored Persian, Greek, and Hindu deities, commissioning carvings of their images on mountain walls. His coins bore engravings of Hindu, Greek, and Persian gods and goddesses.

Kanishka's reign was also a golden era for literature, architecture, sculpture, and painting. He was a great patron of literature, and his court was adorned with scholars like Ashvaghosha, Nagarjuna, Vasumitra, and Charaka. During his rule, Sanskrit regained its lost glory, and numerous renowned works on literature, drama, philosophy, and music were composed.

In architecture, Kanishka's contributions were remarkable. He employed the Greek architect Agesilaus to decorate his court. He beautified his capital, Peshawar, and founded the city of Kanishkapura in Kashmir. During his reign, four distinct art styles flourished: Gandhara, Mathura, Amaravati, and Sarnath. The Gandhara school of art, a synthesis of Greek, Roman, and Indian styles, was the most exquisite. As Ramesh Chandra Majumdar noted, while the hands of Gandhara artists were Greek, their hearts were entirely Indian.

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আরবদের সিন্ধু অভিযান | কারণ ও তাৎপর্য

আরবদের সিন্ধু অভিযান | কারণ ও তাৎপর্য Please visit our Homepage and subscribe us. Suggested Topics || Ghajnavid Invasion || গজনী আক্রমণ || || মামুদের সোমনাথ মন্দির লুণ্ঠন || Somnath Temple Plunder || || তরাইনের যুদ্ধ ও তার গুরুত্ত্ব || মহম্মদ ঘুরির ভারত আক্রমন ও তার চরিত্র || সপ্তম শতকের প্রথমার্ধে আরবদেশে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। ইসলাম আরবদের নতুন করে জীবনীশক্তির সঞ্চার করে । ইসলাম ক্রমশ: একটি ধর্ম থেকে রাজনৈতিক শক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় তারা আরবীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ভারতবর্ষের সঙ্গে আরবদের যোগাযোগ দীর্ঘদিনের। বাণিজ্যিক সূত্রে তারা নিয়মিত ভারতের উপকূল গুলিতে, বিশেষ করে মালাবার উপকূলে আসত। ভারতীয় ও চীনা পণ্য 'ধাও' নামক বিশেষ জাহাজে করে নিয়ে তারা ইউরোপের বাজারে বিক্রি করত। 712 খ্রিস্টাব্দে ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এর সেনাপতি ও জামাতা মোহাম্মদ বিন কাসেম সিন্ধু দেশে একটি সফল অভিযান করেন এবং সিন্ধুদেশ আরবীয় মুসলমানদের অধীনে চলে যায়। অভিযানের(প্রত্যক্ষ) কারণ ভারতবর্ষের প্রতি আরবদের দীর্ঘদিনের নজর ছিল। এর আ...

মহাফেজখানার শ্রেণীবিভাগ | Category of Archives

মহাফেজখানার শ্রেণীবিভাগ মহাফেজখানা বা লেখ্যাগারগুলি সাধারণ জনতার জন্য নয় মূলত গবেষক, ঐতিহাসিক, আইনবিদ, চিত্র পরিচালক প্রভৃতি পেশার লোকজন তাদের গবেষণার কাজে লেখ্যাগারে নথি পত্র দেখতে পারেন।  লেখ্যাগার পরিচালনা ও সংরক্ষিত নথির ভিত্তিতে লেখ্যাগগুলিকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়েছে।   1. সরকারি লেখ্যাগার:- কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার বা স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে যে লেখ্যাগারগুলি গড়ে ওঠে। সেগুলিকে সরকারি লেখ্যাগার বলা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এরকম সরকার পরিচালিত এক বা একাধিক লেখ্যাগার থাকে। যেমন, আমেরিকার Natonal Archive And records Administration (NARA)। ভারতবর্ষে র কেন্দ্রীয় লেখ্যাগার National Archive of India নামে পরিচিত। বিভিন্ন ঐতিহাসিক, প্রশাসনিক ও আইনগত নথি, মানচিত্র, নক্সা,  পাণ্ডুলিপি প্রভৃতি সংরক্ষিত থাকে। 2. বানিজ্যিক লেখ্যাগার:-  এটি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানের লেখ্যাগার বিভিন্ন বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান   মূলত তাদের সংস্থার ঐতিহাসিক এবং বানিজ্যিক নথি সংরক্ষিত রাখে। যেমন, ভারতের প্রথম বানিজ্যিক লেখ্যাগার হলো পুনার Tata Centrel Archive। 3. অলাভজনক লেখ্যাগ...

ষোড়শ শতকীয় ইউরোপে মূল্যবিপ্লব | Price Revolution

 ষোড়শ শতকের ইউরোপে মূল্য বিপ্লব   16 শতাব্দীতে ইউরোপীয় অর্থনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো মূল্য বিপ্লব। নিত্যব্যবহার্য পণ্যের মূল্য প্রায় 150 বছর সুস্থির থাকার পর ঊর্ধ্বমুখী হতে আরম্ভ করে, এবং 16 শতাব্দীর শেষে খাদ্যপণ্যের মূল্যের প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। পশ্চিম ইউরোপের অর্থনীতিতে এমন অভাবনীয় এবং সুদুরপ্রসারী ফলাফলসম্পন্ন ঘটনা মূল্য বিপ্লব নামে পরিচিত। মূল্য বিপ্লবের কতগুলি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যথা--    (১) কৃষিজ পণ্যের তুলনায় শিল্পজাত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি ছিল কম, এবং খাদ্যশস্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। (২) ভূমি রাজস্ব সহ ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক, তোলা ইত্যাদির হার বৃদ্ধি এবং ফটকাবাজির আবির্ভাব। (৩) মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় মজুরির হার খুবই কম ছিল বলে প্রকৃত আয় হ্রাস পেয়েছিল। (৪) ভূমি বিক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত হওয়া। (৫) গ্রামীণ বুর্জোয়াজি শ্রেণীর আবির্ভাব। ষোড়শ শতকের আগেও প্রাকৃতিক কারণে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল, তবে তা ছিল 2, 3 শতাংশের মতো, যা অস্বাভাবিক মনে হতো না। কিন্তু ষোল শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে যে নিরবিচ্ছিন্ন মূল্যবৃদ্ধি হ...